বন্যা আশীর্বাদের পরিবর্তে আতঙ্ক হিসেবে দাঁড়ায় কেন?

রোকনুজ্জামান রোকন:

উজানের পাহাড়ি ঢল যেন প্রতি বর্ষায় অভিশাপ হয়ে দেখা দেয় ভাটির জনপদ উত্তরের জেলাগুলোতে। এবারও চিত্র ভিন্ন নয়। তার সাথে নদী ভাঙ্গন যোগ হয়ে ক্রমাগত দীর্ঘ হচ্ছে সবহারা মানুষের তালিকা।

স্ত্রী সন্তান আর সম্বল বলতে কটা গবাদি পশু নিয়ে মাথা গোঁজার মতো জায়গাটুকু খুঁজে পাচ্ছে না বানভাসি মানুষ। বিপদাপন্ন মানুষগুলো যাদের কাছে একবুক আশা করে, সেই জনপ্রতিনিধি কিংবা সরকারি কর্তারা খড়কুটো হয়েও তাদের পাশে দাঁড়ায় না। বানের জল আর চোখের জল মিশে যেন একাকার! অথচ পত্রিকার পাতা খুললেই অসহায় মানুষগুরোর জন্য কাড়িকাড়ি টাকা আর টনকে টন চাল ডাল বরাদ্দের খবর পাঠকদের বেশ আশ্বস্ত করে।

উল্টোপিঠে বানভাসি মানুষের চিত্র তা বলে না। বানের জল উঠোন বেয়ে ঘর, চৌকি দেখতে দেখতে যখন কোন এক দিন মজুরের ঘরটাই যখন ডুবে যায় সাথে ডুবতে থাকে তাদের স্বপ্ন। ভেসে যায় সারা বছরের সঞ্চয়টুকু, এটা একটা চিত্র। আরেকটা চিত্র আছে তা হলো, দুপাড়ে নদী ভাঙ্গন।

ঘর-বাড়ি, খাবার, গবাদি পশুসহ সবকিছু নৌকায় তুলে আশ্রয়স্থল খোঁজা! দু চিত্রের প্রায় অধিকাংশ মানুষই হয় আশ্রয়কেন্দ্র অথবা যেখানে বড় রাস্তা বা বাঁধ আছে, সেখানে শুরু করে গরু-ছাগলের সাথে মানবেতর জীবন যাপন। সব অঞ্চলে আবার আশ্রয়কেন্দ্র বা বাঁধও নেই। বিগত বন্যাগুলোতে এমনও নজির আছে, যারা কোথাও যেতে পারে না তাদের কেউ কেউ রাত কাটিয়েছে ঘরের চালে।

উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীগুলোতে গত কয়েকদিনে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হ্ওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় এমন অনেক স্কুলঘরও তলিয়েছে বানের জলে। শুধু উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা বা লালমনিরহাট নয় দেশের বন্যাকবলিত পুরো অঞ্চল জুড়ে একই অবস্থা! গ্রামের পর গ্রাম ডুবে যাচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী। বন্যার প্রথম দফা শেষ না হতেই দ্বিতীয় দফার আক্রমণ।

প্রথম দফায় পাট, চিনা, তিলসহ ধানের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। সেই জমিতে আবারও পানি। গত বছর ১৯৮৮ সালের বিপদসীমার ১১২ সেন্টিমিটার রেকর্ড ভেঙ্গে হয়েছিলো ১২১ সেন্টিমিটার। বন্যার ভয়াবহতা দেখেছে দেশ। এবার গতবারের মত না হলেও ব্রহ্মপুেত্রর পানি বিপদসীমার ১০৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবার বন্যা গতবছরের চেয়েও ভয়াবহ হবার আশঙ্কা রয়েছে। তারা বলছেন, দেশের বাইরে নদ-নদীর উজানে এবং দেশেরে অভ্যন্তরে ভারি বৃষ্টিপাত; হিমালয় পর্বতে তুষার গলন এবং প্রাকৃতকিভাবে হিমবাহের স্থানান্তর সংঘটন; পলি সঞ্চয়ের ফলে নদ-নদীর তলদশে ভরাট হয়ে যাওয়া/নদীর র্পাশ্বদশে দখল হয়ে যাওয়া/ভূমধ্বিস সংঘটন; প্রধান প্রধান নদীসমূহে একসঙ্গে পানি বৃদ্ধি এবং এক নদীর ওপর অন্য নদীর প্রভাব বিস্তার; জোয়ারভাটা এবং বায়ু প্রবাহের বিপরীতমুখী ক্রিয়ার ফলে নদ-নদীর সমুদ্রমুখী প্রবাহ ধীরগতি প্রাপ্ত হওয়া ; পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া; ভূ-গাঠনিক বিশৃঙ্খলা (ভূমকিম্প, নদীর প্রবাহ ও ভূরূপতত্ত্বে পরিবর্তন) এগুলোর ফলে বন্যা ও অতিবন্যা দেখা দেয়। বন্যা সমস্যা নয় কিন্তু অতি বন্যা বড় সমস্যা। যা বর্তমানে আমাদের দেশে বিদ্যমান।

এ পরিস্থিতিতে লাখ লাখ মানুষের খাদ্য সংকট পরবর্তীতে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ মোকাবেলা করা দুর্গত মানুষের কাছে অসম্ভব। সরকারের কার্যকরী পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়ন ও বেসরকারী উদ্যোগ সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। নদী নিয়ে বামপন্থী দলগুলো ও পরিবেশবাদীরা দীর্ঘ সময়কাল ধরে আন্দোলন করে আসছে। তারা বারবার বলছে, নদী খনন, ড্রেজিং, নদীর পাড় বাঁধা এবং ভারতসহ প্রতিবেশি দেশের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা। যখন যারা ক্ষমতায় এসেছে কেউই তা করেনি। ফলে নদীর বুক উচু হওয়া, অল্প বন্যায় দুপাড় ভাসিয়ে প্লাবিত হওয়া এবং নদী ভাঙ্গন বর্ষাকালে নদী অঞ্চলের মানুষের নিত্য সঙ্গী।

গ্রামের পর গ্রাম নদী গর্ভে বিলীন, লাখো মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে সহায় সম্বলহীন হয়ে পরে। অন্যদিকে অসম পানি চুক্তির কারণে গ্রীষ্ম মৌসুমে খড়া দেখা দেয়। বর্ষার ভরা মৌসুম ছাড়া সারা বছর নদ-নদী শুখিয়ে খা খা করে। বন্যা মোকাবেলায় নিম্নোক্ত কাজগুলো করা জরুরি বন্যা মোকাবেলায় পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করা ২. নদী খনন করা ৩. বাঁধ মেরামতের নামে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার লুটপাট বন্ধ করা ৪. পানি উন্নয়ন বোর্ডকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রুপান্তর করা ৫. চরাঞ্চল নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ ও চর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা ৬. পানি-নদী গবেষক ও নদী পাড়ের মানুষদের যুক্ত করে কমিটি গঠন করে পরিকল্পনা গ্রহণসহ নানামুখী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ হাতে নেয়া। পরিকল্পনা করলে নদ-নদী গুলো মাছ চাষের অভায়ারণ্য হতে পারে।

অবারিত হবে বব্যসা বাণিজ্যের দ্বার যা আমাদের অর্থনীতিকে একধাপ এগিয়ে নেবে। সেই সাথে নদ-নদী নিয়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে নদীর দু’পাড়ে বনায়ন গড়ে তুলতে পারলে প্রকৃতি পাবে নতুন রুপ। ভূমিহীনদের পূনর্বাসন এবং উন্নত দেশের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নির্ভর বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তুলতে পারলে নদ-নদী সম্পদ হিসেবে ভূমিকা রাখবে। তাহলে নদী-বন্যা দুই-ই আশীর্বাদ হতে পারে দেশের জন্য। আমরা জানি, বন্যা আমাদের বর সরুপ বাস্তবে সেটাই হবার কথা। বন্যায় পলি মাটি পড়ে যা কৃষি আবাদে অন্যতম প্রধান ভূমিকা রাখে। দেশে উল্টোটাই বেশি ঘটে, নদীভাঙ্গনে ঘরবাড়ি বিলীন ও বন্যায় ডুবে দুর্ভোগ পোহানো। ফলে বন্যা বর না হয়ে আতঙ্ক হিসেবে দেখা দেয় বারেবারে।

চলতি বন্যায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারা দুস্কর তবে ভবিষ্যতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা ছাড়া এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় নেই। বর্তমান সময়ে বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়াতে এখনো কোন পরিকল্পনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যতটুকু গ্রহণ করা হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। করোনাকালীন দুযোর্গে অতিবন্যা মড়ার উপর খড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসময়ে কাজ হারিয়ে দিশেহারা মানুষ অসহায় জীবনযাপন করছে।

লাখ লাখ মানুষের খাদ্য সংকট এবং পরবর্তীতে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ। সরকারের কার্যকর পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়ন ও বেসরকারী উদ্যোগ সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। সরকার, দেশের বিবেকবান ও সামর্থ্যবান মানুষ বানভাসি মানুষের

রোকনুজ্জামান রোকন সাবেক সভাপতি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট রংপুর জেলা শাখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.