বানভাসিদের ভেসে যাওয়া ও রাষ্ট্রের অবহেলা

রোকনুজ্জামান রোকন।।
বাড়িতে বানের পানি আজ ১৫ দিনের বেশি, শুরুতে খাবার জুটলেও কয়েকদিন যাবৎ একবেলা দুমুঠো চিড়া তো আর একবেলা এক মুঠো মুড়ি। এখন তাও ফুরিয়ে আসছে!
কোন রকমে জান বাঁচানো, বাস্তবে বন্যার সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকা! পানি সকালে কমে তো বিকেলে আবার বাড়ে! যাদের হাত চললে পেট চলে তারা এখন কর্মহীন, বড়রা কোনরকমে পেটে কষ্ট নিয়ে টিকে থাকার লড়াই করলেও- ক্ষেতমজুর-দিনমজুর পরিবারের শিশুদের ছোট্ট পেটে যখন বড় হয়ে দেখা দেয় ক্ষুধার কষ্ট সেই জ্বালা অভিভাবকদের মেনে নেয়া বড়ই যন্ত্রণার।
দু:খ-কষ্টের সাগরে হাবুডুবু করা মানুষগুলো এখন প্রহর গুণছে কবে কখন বানের জল নেমে যাবে। কিন্তু রেডিও-টেলিভিশনগুলো যখন চতুর্থবারের মতো দীর্ঘায়িত বন্যার আভাস দেয় তখন টিকে থাকার আশাটুকুও ফ্যাকাসে হয় বানভাসী মানুষের। সরকারি হিসেবেই গত তিন সপ্তাহে বন্যার পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে ৮৬ জন মারা গেছে। মৃত্যু হওয়া ৮৬ জনের মধ্যে ৭১ জনই পানিতে ডুবে মারা গেছে। ২১ জেলায় ৩০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী। পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে ৬ হাজার ৩৮০ জন।
মৃতের হিসেবগুলো আমাদের কাছে হয়তো পরিসংখ্যান কিন্তু যারা স্বজন-হারা মানুষের কাছে সব থেকে বেদনার! দাফনের জন্য এক টুকরো শুকনো জমি না পেয়ে যখন কলা গাছের ভেলায় ভাসিয়ে দিতে হয়েছে স্বজনদের অনেকের লাশ! পানিতে ভেসে যাওয়া লাশের ভেলা আস্তে আস্তে চোখের সামন থেকে সরে যাওয়ার দৃশ্য এবং সারা জীবন এ দুঃস্বপ্নের দুঃসহ স্মৃতি বহন করা! কথাগুলো অনুভব করলে হয়তো পরিসংখ্যানটার আলাদা মানে দাঁড়াবে আমাদের কাছে। হয়তো সংখ্যাটা হিসেব না হয়ে বন্যার্ত জনপদের বেদনার ইতিহাস হিসেবে চোখের সামনে ভেসে বেড়ায় তখন! অজান্তেই চোখের কোণ ভিজে উঠে।
প্রতিবারের মতো উজানের পাহাড়ি ঢল এবারের বর্ষাতেও ভাটির জনপদ উত্তরের জেলাগুলোতে এসেছে অভিশাপ হয়ে। তার সাথে নদী ভাঙ্গন যোগ হয়ে ক্রমাগত দীর্ঘ হচ্ছে সবহারা মানুষের তালিকা। স্ত্রী-সন্তান আর সম্বল বলতে কটা গবাদি পশু নিয়ে মাথা গোঁজার মতো জায়গাটুকু খুঁজে পাচ্ছেনা বানভাসি মানুষ। বিপদাপন্ন মানুষগুলো যাদের কাছে একবুক আশা করে, সেই জনপ্রতিনিধি কিংবা সরকারি কর্তারা খড়কুটো হয়েও তাদের পাশে দাঁড়ায় না। অন্য বছরগুলোতে বন্যায় বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীরা যেভাবে সর্বশক্তি নিয়ে বানভাসী মানুষের পাশে দাঁড়াতো এবার করোনাকালে তাও চোখে পড়ছে না। বানের জল এবার তাই কষ্টের নোনাজল হয়ে দুচোখ বেয়ে বুক ভেসে যাচ্ছে বানভাসী মানুষের। অন্যদিকে অসহায় মানুষগুলোর জন্য কাড়িকাড়ি টাকা আর টনকে টন চাল ডাল বরাদ্দের নামে সরকারী দলের নেতা আর প্রশাসনের পক্ষ থেকে বড় বড় কথা বলে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেও বানভাসি মানুষের কাছে তা পৌঁছায় না! পত্রিকায় খবর বেড়োয় বন্যার ত্রাণ লুটপাট হয়েছে!
বানের জল উঠোন বেয়ে ঘর, চৌকি দেখতে দেখতে যখন কোন এক দিন মজুরের ঘরটাই ডুবে যায় সাথে ঘরটার মতোই ডুবতে থাকে তার স্বপ্ন। ভেসে যায় সারা বছরের স য়টুকু, এটা একটা চিত্র। আরেকটা চিত্র আছে তা হলো, দুপাড়ে নদী ভাঙ্গন। ঘর-বাড়ি, খাবার, গবাদি পশুসহ সবকিছু নৌকায় তুলে আশ্রয়স্থল খোঁজা! দু চিত্রের প্রায় অধিকাংশ মানুষই হয় আশ্রয়কেন্দ্র অথবা যেখানে বড় রাস্তা বা বাঁধ আছে, সেখানে শুরু করে গরু-ছাগলের সাথে মানবেতর জীবন যাপন। সব অ লে আবার আশ্রয়কেন্দ্র বা বাঁধও নেই। বিগত বন্যাগুলোতে এমনও নজির আছে, যারা কোথাও যেতে পারে না তাদের কেউ কেউ রাত
কাটিয়েছে ঘরের চালে এবারও তাই ঘটলো অনেক অ লে।
উত্তরা লের নদ-নদীগুলোতে গত কয়েকদিনে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় এমন অনেক স্কুলঘরও তলিয়েছে বানের জলে। শুধু উত্তরা লের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা বা লালমনিরহাট নয় দেশের বন্যাকবলিত পুরো অ ল জুড়ে একই অবস্থা! গ্রামের পর গ্রাম ডুবে যাচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী। বন্যার প্রথম দফা রেশ কাটতে না কাটতে দ্বিতীয় দফা আবার কোন বিরতি ছাড়াই তৃতীয় দফা আক্রমণ। আবারো চতুর্থ দফায় বন্যার চোখ রাঙ্গানী সামলাবার মতো কোমড়ে শক্তি নেই চর-দ্বীপচরের গরীব মানুষের।
১৯৮৮ সালের বিপদসীমার ১১২ সেন্টিমিটার রেকর্ড ভেঙ্গে গত বছর হয়েছিলো ১২১ সেন্টিমিটার। চতুর্থ দফার বন্যা ৮৮’র রেকর্ড ভাঙ্গতে পারে, আগষ্ট মাস পর্যন্ত বন্যা স্থায়ী হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের এমন বিশ্লেষনে অনেকেই আতঙ্কিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বাইরে নদ-নদীর উজানে এবং দেশেরে অভ্যন্তরে ভারি বৃষ্টিপাত; হিমালয় পর্বতে তুষার গলন এবং প্রাকৃতকিভাবে হিমবাহের স্থানান্তর সংঘটন; পলি স য়ের ফলে নদ-নদীর তলদশে ভরাট হয়ে যাওয়া/নদীর র্পাশ্বদশে দখল হয়ে যাওয়া/ভূমধ্বিস সংঘটন; প্রধান প্রধান নদীসমূহে একসঙ্গে পানি বৃদ্ধি এবং এক নদীর ওপর অন্য নদীর প্রভাব বিস্তার; জোয়ারভাটা এবং বায়ু প্রবাহের বিপরীতমুখী ক্রিয়ার ফলে নদ-নদীর সমুদ্রমুখী প্রবাহ ধীরগতি প্রাপ্ত হওয়া; পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া; ভূ-গাঠনিক বিশৃঙ্খলা (ভূমকিম্প, নদীর প্রবাহ ও ভূরূপতত্ত্বে পরিবর্তন) এগুলোর ফলে বন্যা ও অতিবন্যা দেখা দেয়। বন্যা সমস্যা নয় কিন্তু অতি বন্যা বড় সমস্যা। যা বর্তমানে আমাদের দেশে বিদ্যমান।
এ পরিস্থিতিতে লাখ লাখ মানুষের খাদ্য সংকট পরবর্তীতে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ মোকাবেলা করা দুর্গত মানুষের কাছে অসম্ভব। প্রতিবার যখন আমাদের বন্যার ধকল সামলাতে হয় তখন স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত কোন সরকারই বন্যা মোকাবেলায় আগাম কোন পদক্ষেপ নেয়নি।
আগেভাগে যদি বন্যার পূর্বাভাস দেয়া যায় তাহলে মানুষ পূর্বপ্রস্ততি নিতে পারে। পাশাপাশি বন্যা উপদ্রুত এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করে মানুষের পাশাপাশি গবাদীপশুর জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হতো তাহলে বানভাসী মানুষের দূর্ভোগ লাঘব করা সম্ভব হতো। বন্যার পানি নেমে যাবার পরপরই আবার তারা কিভাবে ঘুরে দাঁড়াবে তারও কোন পরিকল্পনা আমাদের নেই। তার চেয়েও বড় কথা নদ-নদীগুলো খনন না করায় পানি ধারণ ক্ষমতা হারানোর ফলে সামান্য পানি বাড়লেই বিপদসীমা ছাড়িয়ে মানুষের বাড়িঘর ভাসিয়ে নেয় বন্যার জল। বিশেষ করে চরা লে যারা সারাবছর গতর খেটে ফসল উৎপাদন করে কিছু পয়সা জোগার করে তারাই প্রথম বন্যার আক্রমনের শিকার হয়। তাদের সারাবছরের স য়টুকু ভেসে যায় বানের তোড়ে।
তাহলে চর-দ্বীপচরে যারা বসবাস করে তাদের অন্যত্র পুনর্বাসনের যদি সুযোগ নাই থাকে ভিটেমাটি উচু করে তাদের জীবন মান উন্নয়নে কোন পদক্ষেপ কি আমরা কোনকালে দেখেছি? বন্যা আসবে মানুষ যুদ্ধ করবে, সরকার সামান্য ত্রাণ দিয়ে দায় সারবে আর মানুষের পুকুরের পর পুকুরের মাছ ভেসে যাবে, ফসল নষ্ট হবে, বাড়িঘর বিলীন হয়ে হাজার হাজার মানুষ উদ্বাস্ত হবে এ যেন নির্মম নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে! গেলো বছর স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় উত্তরের হাজার হাজার মাছ চাষী, কৃষক, ক্ষেতমজুর-দিনমজুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিন্তু তাদের পুনর্বাসনের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
শুধু কি তাই, গত বছর বাঁধভাংগা বন্যায় চুরমার হয়ে যাওয়া রাস্তাঘাট এখনো দগদগে ক্ষত হয়ে আছে উত্তরের পথে প্রান্তরে। তবে কি আমরা সারা বছর সংসদ, রেডিও-টিভিতে কর্তাদের বড়বড় বয়ান শুনেই যাবো নাকি কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে পাবো এমন প্রশ্ন সবমহলের।
প্রতিবছর নদ-নদীতে পানি বাড়লে নদী ভাঙ্গে আবার পানি কমলেও ভাঙ্গে। গ্রামের পর গ্রাম নদী গর্ভে বিলীন হয়, লাখো মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে সহায় সম্বলহীন হয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। আত্মীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন কারো সাথে কারো দেখা হয়না। একেকজনের বাস একেক জেলায়। বাবা ঢাকায় রিকশা চালায়, সন্তান চট্টগ্রামে শ্রম বিক্রি করে, পরিবারের অন্য কেউ নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টসে চাকরী নেয়। পুড়ে মরে, ঈদ-পূজোর মতো উৎসব পার্বনে নাড়ীর টানে বাড়ি ফিরতে গিয়ে সড়কে প্রাণ হারায় এই ছন্নছাড়া মানুষগুলিই!
এমন নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে না চাইলে সরকারী-বেসরকারীভাবে একটু উদ্যোগ আর পরিকল্পনা গ্রহণ করলে চিত্র ভীন্ন হতে পারে। ত্রাণ কিংবা সাহায্যের জন্য কাউকেই ভাবতে হবে না। লাখো-কোটি মানুষ বন্যার দূর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে যদি সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছ থাকে। বন্যা মোকাবেলায় পূর্বপ্রস্তুতিও লাগবেনা যদি দেশের নদ-নদীগুলো খনন করে দুপাশ উচু করে সেখানে বাস্তহারা মানুষকে পূনর্বাসন করা হয়।
বাঁধ মেরামতের নামে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার লুটপাট বন্ধ করে সত্যিকার অর্থে বাঁধগুলো শক্তিশালী করে স্থানীয়দের সহায়তায় সেখানে বনায়ন করা হয় তাহলে রাষ্ট্র এবং তার নাগরিক উভয়ই লাভবান হতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে নদীপাড়ের মানুষ এবং জনপ্রতিনিধি-গণ্যমান্য ব্যক্তিদের যদি যুক্ত করা হয় তাহলে প্রতিষ্ঠানটির জবাবদিহিতা যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি পাউবো একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে। আবার চরা ল নিয়ে পরিকল্পনার জন্য যদি একটি চর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হতো তাহলে চরের ফসল, জীবন-জীবিকা সব কিছুই হতো পরিকল্পিত। পরিকল্পনা করলে নদ-নদী গুলো মাছ চাষের অভায়ারণ্য হতে পারতো। অবারিত হতো ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বার যা আমাদের অর্থনীতিকে একধাপ এগিয়ে নেবে।
বন্যা আমাদের বর সরুপ বাস্তবে সেটাই হবার কথা। বন্যায় পলি মাটি পড়ে যা কৃষি আবাদে অন্যতম প্রধান ভূমিকা রাখে। দেশে উল্টোটাই বেশি ঘটে, নদীভাঙ্গনে ঘরবাড়ি বিলীন ও বন্যায় ডুবে দুর্ভোগ পোহানো। ফলে বন্যা বর না হয়ে আতঙ্ক হিসেবে দেখা দেয় বারেবারে। চলতি বন্যায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারা দুস্কর তবে ভবিষ্যতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা ছাড়া এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় নেই।বর্তমান সময়ে বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়াতে এখনো যথেষ্ঠ উদ্যোগ-পরিকল্পনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যতটুকু গ্রহণ করা হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
করোনাকালীন দুযোর্গে অতিবন্যা মড়ার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনিতেই লাখ লাখ মানুষের খাদ্য সংকট এবং পরবর্তীতে আবার অপেক্ষা করছে পানিবাহিত নানা রোগ-ব্যাধি। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের কার্যকর পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
লেখক।।
রোকনুজ্জামান রোকন
সাবেক সভাপতি
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, রংপুর জেলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.