আন্তর্জাতিক ইক্যুয়াল পে ডে, বৈশ্বিক মহামারী ও নারী প্রেক্ষাপট 

উম্মে কুলছুম-

শ্রম অধিকার থেকে ধারণা পাওয়া যায় সমান কাজের জন্য সমান মূল্য। অর্থাৎ একই কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তিদের সমান বেতন দেওয়া হয়। সমান কাজের জন্য সমান বেতন তখনই প্রযোজ্য হয় যখন কর্মীরা একটি প্রতিষ্ঠানে একই পর্যায়ের কাজ করে সেটা ছেলে মেয়ে যে কেউ হোক না কেন তাদের জন্য সমান বেতন প্রযোজ্য।

ইক্যুয়াল পে ডেঃ ২০০৮ সালে সর্বপ্রথম জার্মানিতে ইকু আন্ডে আয়োজন করা হয়েছিল প্রথম ইক্যুয়াল পে ডে। এই দিবস পালনের একটাই উদ্দেশ্য ছিল যেন নারী-পুরুষ উভয়ই সমান কাজের জন্য সমান বেতন পান।

জার্মানের ৩০টি শহরের ক্লাবগুলো আলোচনার মাধ্যমে এই দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং রাস্তায় দাঁড়িয়ে তারা লাল ব্যাগ বিতরণ করেছিল। বেতন বৈষম্যে সারাবিশ্বে নারীর অবস্থাঃ সমস্ত অঞ্চল জুড়ে, নারীদের পুরুষদের তুলনায় কম বেতন দেওয়া হয়। অনুমান করা হয়, বিশ্বব্যাপী লিঙ্গের ভিত্তিতে বেতনের ব্যবধান ২৩ শতাংশ ।

নারী-পুরুষের মধ্যে ঐতিহাসিক এবং কাঠামোগত অসম শক্তি, দারিদ্র্য এবং অসমতা এবং সংস্থানসমূহে সুযোগ এবং সুযোগ- সুবিধাগুলো নারী ও মেয়েদের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করে। জেন্ডার সাম্যতা ও নারীর ক্ষমতায়ন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই ব্যবধানটি দূর করার প্রক্রিয়া খুব ধীরে ধীরে হচ্ছে।

যদিও পুরুষ ও মহিলাদের সমান বেতনের অধিকারকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এটি প্রয়োগ করা কঠিন। বিশ্বজুড়ে, পুরুষদের দ্বারা উপার্জিত প্রতিটি ডলারের জন্য নারী উপার্জন করে মাত্র ৭৭ সেন্ট। যা পুরুষ এবং নারীদের মধ্যে আজীবন আয়ের অসাম্য তৈরি করে। শিশুদের ও নারীদের আরও বেশি মজুরির ব্যবধান রয়েছে।

এই হারে বৈশ্বিক লিঙ্গ বেতনের অসামঞ্জস্যতা বন্ধ করতে পরবর্তী ২৫৭ বছর সময় লাগবে বলে ধারণাকরা হয়। নারীরা অধিকতর কাজ করলেও তারা নিরাপত্তাহীনতার ভোগে স্বল্প বেতনের, নিম্ন দক্ষতার কাজে মনোনিবেশ করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকার ক্ষেত্রে নিম্ন-প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। নারী রা পুরুষদের তুলনায় কমপক্ষে আড়াই গুণ বেশি বেতনের গৃহস্থালি ও যত্নের কাজ করে থাকে যার মূল্যায়ন আজও তারা পায় না। আন্তর্জাতিক ইক্যুয়াল পে ডেঃ ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো সারা বিশ্বে উদযাপিত হয় আন্তর্জাতিক ইক্যুয়াল পে ডে।

এই দিবস পালন সমমূল্যের কাজের জন্য সমান বেতনের অর্জনের জন্য দীর্ঘকালীন প্রয়াসের প্রতিনিধিত্ব করে। এটি জাতিসংঘের মানবাধিকারের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা এবং নারী ও মেয়েদের প্রতি বৈষম্য সহ সকল ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি দেয়। ইক্যুয়াল পে ডে ও এসডিজিঃ কেউ যাতে পিছনে না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ (এসডিজি) লিঙ্গ সমতা অর্জনের জন্য এই দিবসের প্রয়োজন রয়েছে।

টেকসই উন্নয়নের ২০৩০ সালের এজেন্ডা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই দিবস লিঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গির মূল ধারাবাহিকতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ইক্যুয়াল পেডে ২০২০ ও বৈশ্বিক মহামারীঃ প্রথমবারের মত অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইক্যুয়াল পেডে যে কথার উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে তা হলো, বেতনের সমতা নিশ্চিত করে কাজের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। নারীদের তাদের প্রাপ্য বেতনটুকু যেন দেওয়া হয় সেটাই এই দিবস পালনের মূল লক্ষ্য।

নারীকে বেশি বেতন দিতে হবে না। কিন্তু সে যতটুকু পাবে তাকে যেন সেটুকুই দেয়া হয়। COVID-19 মহামারীটিও নারীর কর্মক্ষেত্রের উপর প্রভাব ফেলেছে।

কানাডিয়ান সেন্টার ফর পলিসি অল্টারনেটিজ অনুসারে, কানাডায় কর্মরত নারীদের মধ্যে ১৩% নারী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিতে রয়েছেন, যেখানে নারীর তুলনায় ৯% শ্রমজীবী ​​পুরুষ ছাটাই ঝুঁকিতে আছে । নারীরা স্বল্প মজুরিতে চাকরিপ্রাপ্তদের তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতিনিধিত্ব করেন এবং ফলস্বরূপ সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন তারা।

এটিও বেতন সমতার প্রয়োজনীয়তা প্রদর্শন করে। কানাডার সাথে সাথে সারাবিশ্বে মহামারীজনিত রোগের ফলে নারীরা যেনো আরও পিছিয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করতে নারীদের অবশ্যই সুযোগ সুবিধা সহ সমান বেতনের ব্যাপারটা নিশ্চিত করতে হবে।

এই বৈশ্বিক মহামারীতে অনেক নারীই আজ বিপদগ্রস্ত। চাকরী ক্ষেত্র, সংসার ক্ষেত্র থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রেই। এই অবস্থায় তার প্রাপ্যটা পাওয়া বেশি প্রয়োজন। শান্তিময় পৃথিবী গড়ে তুলতে সমান বেতন প্রদানের বিকল্প নেই। এই মূলমন্ত্র সকল প্রতিষ্ঠান, সকল ব্যক্তির হওয়া উচিত।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.