শান্তি, শান্তি দিবস ও নারীঃ প্রত্যাশা পূরণের আর কত দেরি?

-উম্মে কুলছুম

এত এত অশান্তির ভিড়ে শান্তি খুঁজে বেড়ান মানুষ। সব সময় মানুষ চায় একটু শান্তিতে থাকতে। সমাজে হানাহানি, মারামারি, হিংসা-বিদ্বেষ, খুনোখুনি ভুলে গিয়ে শান্তি ও সম্প্রীততে ভরপুর একটা বিশ্ব দেখতে চায় বিশ্ববাসী।

শুধু দেখতে চাইলেই কি হবে? তাইতো ২১ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব শান্তি দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। শান্তিঃ শান্তি যাকে ইংরেজিতে বলা হয় পিস বা Peace, কোন প্রকার সংঘর্ষ কিংবা যুদ্ধবিহীন সময়কাল।

বৃহৎ পরিসরে বলতে চাই তাহলে শান্তি বলতে রাষ্ট্রের ঐক্য, শান্ত অবস্থা বিরাজমান যা অন্য কোন কিছু বিঘ্নতা সৃষ্টিকারী পরিবেশ দ্বারা আক্রান্ত না হওয়াকে বুঝায়। জনগণ ও সংগঠনের অভ্যন্তরে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করাই রাষ্ট্রের ইপ্সিত লক্ষ্য হওয়া উচিত। শান্তির স্বপক্ষে চিরজাগরুক ব্যক্তিত্ব মার্টিন লুথার কিং, জুনিয়র বার্মিংহ্যাম কারাগার থেকে এক চিঠিতে লিখেছেন যে- “সত্যিকারের শান্তি কেবলমাত্র উদ্বিগ্নেরই অনুপস্থিতি ঘটায় না; বরঞ্চ ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা ও উপস্থিতিজনিত কারণে হয়ে থাকে।

” অন্যভাবে বলা যায় যে, প্রকৃত শান্তি তখনই ঘটে যখন সমস্যা, ভয়-ভীতির পরিবেশ দূরীভূত হয়। বিশ্ব শান্তি দিবসঃ বিশ্ব শান্তি দিবস বা আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস জাতিসংঘ কর্তৃক প্রস্তাবিত একটি দিন যা আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে থাকে। জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত বিশ্বের সকল দেশ ও সংগঠন কর্তৃক যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে এই শান্তি দিবস পালন করা হয়ে থাকে। পৃথিবী থেকে যুদ্ধ, হিংসা, আগ্নেয়াস্ত্র প্রয়োগের মতো ঘটনা মুছে ফেলতেই প্রতি বছর ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে।

এখানে বলে রাখা ভালো যে, সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস প্রথমবার পালন করেছিল ১৯৮২ সালে। ১৯৮২ সালে এই দিবসের থিম ছিল – “The Right to peace or people”. একটি যুদ্ধবিহীন বিশ্ব প্রতিষ্ঠার (যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই স্লোগানে) লক্ষ্যে ১৯৮১ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত নম্বর ৩৬/৬৭ প্রস্তাব অনুসারে প্রতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের “তৃতীয় মঙ্গলবার” জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার দিনটিকে “আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

পরবর্তীতে, ২০০১ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি বছর এদিন বিশ্ব শান্তি দিবস হিসেবে পালন করা হয়। একসাথে শান্তি গড়িঃ প্রতিবারের মত এবারও সারাবিশ্বে পালিত হচ্ছে বিশ্ব শান্তি দিবস ২০২০। এবার শান্তির পদযাত্রা ও সম্মিলিত শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন হচ্ছে না। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশ্ব শান্তি দিবসের প্রতীক ব্যবহার করে বা ভার্চুয়াল নানান আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়।

দিবসটিতে এবারের প্রতিপাদ্য ‘একসাথে শান্তিতে রূপান্তর’ বা এক সাথে শান্তি গড়ি ইংরেজিতে যাকে বলা হচ্ছে ‘শেপিং পিস টুগেদার বা Shaping Peace Together’ বৈশ্বিক মহামারী ও কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে শান্তি আসলেই খুব কাম্য একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সবার জীবনে। একটু মুক্ত পরিবেশ একটু মুক্ত জীবনের মাঝে শান্তি খুজে ফিরছে সবাই। প্রতিবছরের মত এবারও আলাদা আহবান নিয়ে শান্তি এসেছে বিশ্বের দুয়ারে। এক সাথে এই মহামারী পরিস্থিতি সামাল দিয়ে শান্তি আসবে এই প্রত্যাশা সবার।

নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসেই সেটা সম্ভব। শান্তির প্রত্যাশা কি পূরণ হয়েছেঃ বিশ্ব শান্তি দিবস যখন থেকে পালন করা হচ্ছে সে সূচনালগ্নে এই সুবিশাল পৃথিবীর আনাচে কানাচে নিপীড়িত ও নির্যাতিত জাতিরা একটি সবুজ স্বপ্ন দেখেছিল, তারা সোনালি আশায় বুক বেঁধেছিল যে, বিশ্ব থেকে বিদায় নিতে চলেছে অন্যায়-অবিচার, ঘুচতে চলেছে ধর্ম আর বর্ণের বিদ্বেষ, মিশে যাবে ধনী-গরিবের ব্যবধান, হারিয়ে যাবে ক্ষমতার দাম্ভিকতা আর আধিপত্যবাদের দাপট, থেমে যাবে সংঘাত আর হানাহানি। তারা সেদিন ভেবেছিল আমরা ভুলে যাবো যুদ্ধ বিদ্রোহ, আমাদের থাকবে না কোন যুদ্ধ যুদ্ধ মনোভাব, বন্ধ হবে অস্ত্রাগার গুলো। যার ফলশ্রুতিতে সারা বিশ্ব জুড়ে হানাহানি থাকবে না, চারিদিকে বইবে শান্তির সুশীতল বাতাস, যে বাতাসে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিতে পারবে ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ সকলে, কারো জন্য কোন ভেদাভেদ থাকবে না, না জাতিতে জাতিতে না মানুষে মানুষে। যেখানে নারী-পুরুষ সবাইকে সমান চোখে দেখা হবে।

সেখানে থাকবে শুধু শান্তি আর শান্তি। সুদীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে মানুষ শুধু আশায় ভরসা করেই পালন করে যাচ্ছে বিশ্ব শান্তি দিবস। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কম সময় নয় এটা। কিন্তু পৃথিবী কি পেয়েছে শান্তির দেখা? আজও এই বিশ্বের আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়ায় অশান্তির লেলিহান শিখা। জাতিতে জাতিতে ভেদাভেদ, মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ, নারী-পুরুষে ভেদাভেদ, ধনী-গরিবে ভেদাভেদ আজ বিশ্বকে শান্তি থেকে সহস্র ক্রোশ দূরে রেখেছে। তবুও মানুষ স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে শান্তিময় পৃথিবীর। সেই লক্ষ্যে কাজও করে যাচ্ছে।

শান্তি, শান্তি দিবস ও নারীর ভূমিকাঃ শান্তি প্রতিষ্ঠায় পুরুষের পাশাপাশি নারীও কাজ করে যাচ্ছে। বরং বলা যায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীর ভূমিকা পুরুষের চেয়ে একটু বেশি। নারী সেবা দিয়ে, যত্ন দিয়ে অবদান রেখে যাচ্ছে এই বসুন্ধরায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে।

প্রকৃতি গত ভাবেই শান্তি শব্দটা পুরুষের চেয়ে নারীর সাথেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবুও এই নারীই নির্যাতনের মাধ্যমে হচ্ছেন অশান্তির শিকার। পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীর ভূমিকা অপরিসীম। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই যে নারী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছে তাকে নির্যাতন করে অশান্তির দিকে ঠেলে দেওয়া সম্পূর্ণ অসুস্থ মানসিকতার পরিচয় বহিন করে। তাই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সর্বোপরি শান্তি হলো নিজেকে দিয়ে। সবাই যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে শান্তি বজায় রাখতে চায় তাহলে অশান্তি বা দাঙ্গা হাঙ্গামা সৃষ্টি হওয়ার কোন সুযোগ থাকে না। তাই শুধু দিবস পালন নয়, নিজেকে শুধরাতে হবে। তবেই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তথা সারা বিশ্বে শান্তি আনয়ন করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published.