শহীদুন্নবীকে হত্যাই ধর্মের অবমাননা

একটা বিষয় আমি ঠিক বুঝতে পারি না, পৃথিবীতে এমন কোনো ধর্ম কি আছে যেটি বিনাবিচারে কোনো মানুষকে পিটিয়ে মেরে তারপর সেই লাশ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলাকে অনুমোদন করে? অথচ এই দেশে সেটাই হয়েছে। একেবারে সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটের পাটগ্রামে একজন ধার্মিক মানুষকে কেবল সন্দেহের ওপর নির্ভর করে এরকম নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।

শহীদুন্নবী জুয়েল নামে এক ভদ্রলোক নামাজ পড়তে ঢুকেছিলেন পাটগ্রামের বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। আসরের নামাজ। নামাজ শেষে তিনি মসজিদের শেলফ থেকে একটি ধর্মীয় বই বের করে পড়তে যান। বইটি নামানোর সময় শেলফে থাকা একটি কোরআন শরিফ মেঝেতে পড়ে যায়। আর এ নিয়েই বিপত্তি। কিছু লোক দাবি করতে থাকে- জুয়েল ইচ্ছা করেই কোরআনটি মাটিতে ফেলে দিয়েছে। এ নিয়ে কথা কাটাকাটি, তারপর শারীরিক নিগ্রহ। জুয়েলের সঙ্গে তার বন্ধু জোবায়ের ছিলেন। তাকেও মারধর করা হয়। এই অবস্থায় তাদেরকে উদ্ধার করে নিয়ে যান বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের একজন কাউন্সিলর। দুজনকে তিনি ইউপি কার্যালয়ের একটি কক্ষে লুকিয়ে রাখেন, বাইরে থেকে দরজায় তালা মেরে দেন। এরইমধ্যে কিছু লোক সাধারণ জনতাকে উত্তেজিত করে তোলে, ক্ষিপ্ত জনগণ ইউপি কার্যালয় ঘেরাও করে। খবর পেয়ে সেখানে পুলিশও আসে। কিন্তু ততক্ষণে দরজা ভেঙে উন্মত্ত জনতা জুয়েল ও জোবায়েরকে পিটুনি দেয়। পুলিশ জোবায়েরকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করতে পারলেও জুয়েলকে পারেনি। বেধড়ক পিটুনিতে জুয়েল সেখানেই মারা যান। পরে তার লাশ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

এই যে ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হলো- এটা মিডিয়া থেকে পাওয়া। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো- বৃহস্পতিবারের এই ঘটনাটি কিন্তু তেমন করে সংবাদপত্র বা অনলাইন মিডিয়াতে আসেনি। মাত্র দুটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমে খবরটি পাওয়া যায়, যার একটিতে আবার মসজিদের শেলফ থেকে বই নামাতে যেয়ে কোরআন শরিফ পড়ে যাওয়ার বিষয়টি বলা হয়নি। কেবল কোরআনের অবমাননা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে এ কথাও বলা হয়েছে যে, জুয়েলকে গণপিটুনি দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে।

হত্যার পর আগুনে পোড়ানো হোক বা আগুনে পুড়িয়ে মারা হোক- দুটোই ভয়াবহ নৃশংসতা, মারাত্মক অপরাধ। কারা করলো এমন জঘন্য কাজ? ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তারা অনুসন্ধান করবে। হয়তো অপরাধী চিহ্নিত হবে। কিন্তু তারও আগে প্রশ্ন হচ্ছে- এই দেশে এমন একটি জঘন্য অপরাধ ঘটল কীভাবে? আমাদের দেশের মানুষ কি এতটাই হিংস্র, এতটাই অপরাধপ্রবণ? আমি তো গ্রাম দেখেছি, উপজেলা পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করেছি। সাধারণ মানুষকে আমার কাছে খুবই সহজ সরল মনে হয়েছে। হ্যাঁ, এটা ঠিক তাদের অধিকাংশই ধর্মভীরু, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অজ্ঞানতার কারণে তারা কিছু মাত্রায় ধর্মান্ধও। কিন্তু কোনো বিবেচনাতেই তারা এমন উগ্র নয়, জঙ্গি নয়। তবে মাঝে-মধ্যে তারা হুজুগে মেতে ওঠে। এ ক্ষেত্রে কোনটা হয়েছে- তদন্ত কমিটি হয়তো সেটাই খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। তবে তারও চেয়ে জরুরি প্রশ্ন হচ্ছে- সেই হুজুগটা তুললো কে বা কারা? কী ছিল তাদের উদ্দেশ্য?

জানা গেছে, জুয়েল ও জোবায়েরের বাড়ি বুড়িমারি নয়, রংপুরে। তারা সেদিন রংপুর থেকে সেখানে গিয়েছিলেন ওষুধ কিনতে। মধ্যবয়সী জুয়েল রংপুর ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে আগে চাকরি করতেন, গ্রন্থাগারিক ছিলেন। তার কিছুটা মানসিক সমস্যা ছিল, এ জন্য তিনি ভারতের একটি ওষুধ সেবন করতেন। সেই ওষুধটি সংগ্রহের জন্যই সেদিন তিনি গিয়েছিলেন সীমান্তবর্তী বুড়িমারীতে। যে মসজিদে তিনি সেদিন নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন, তার খাদেম জানিয়েছেন- মসজিদের মধ্যেই পাঁচ থেকে ছয়জন ব্যক্তি জুয়েল ও জোবায়েরকে প্রথমে মারধর শুরু করে। এরপরই সেখান থেকে তাদেরকে উদ্ধার করেন স্থানীয় ইউপি সদস্য।

এই তথ্য থেকে এতটুকু অন্তত ধারণা করা যায় যে, ওই পাঁচ ছয়জনই হচ্ছে নাটেরগুরু। তারাই পরে এলাকাবাসীকে উত্তেজিত করেছে। এই হুজুগ তৈরির মূলে যারা ছিল, তারাই যে জনগণকে ধর্মের নাম করে অধর্মের কথাই শুনিয়েছে, সে বিষয়ে আমার অন্তত কোনো সন্দেহ নেই। ঘটনাগুলো কিন্তু এভাবেই ঘটে। জঙ্গিরা যখন ধর্মপ্রাণ মানুষের মগজধোলাই করে, তখন তারা ধর্মকে এরকম খণ্ডিতভাবেই ব্যবহার করে থাকে। কারণ প্রকৃত ইসলাম কখনোই এরকম জঘন্য নৃশংসতাকে অনুমোদন করতে পারে না।

আসলে ‘কোরআনের অবমাননা’ ঠিক কীভাবে ঘটেছে- সেটা দুটি মাত্র মিডিয়াতে প্রকাশিত খবর পড়ে যথাযথ অনুমান করা সম্ভব নয়। শেলফ থেকে একটি বই নিতে যেয়ে যদি দুর্ঘটনাবশত কোরআন শরিফ নিচে পড়ে যায়, কিংবা যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, ওই ব্যক্তি কোরআনকে ইচ্ছা করেই ফেলে দিয়েছে- তবুও কি এটি কোনো হত্যাযোগ্য অপরাধ? কোরআনের আলোকেই কেউ কি এ ধরনের কাজকে অনুমোদিত বলে প্রমাণ করতে পারবেন? যদি পারেন, তাহলে তো তার আর সামনে আসতে কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয়। প্রকাশ্যে এখন সে বলতেই পারে, এই কাজ তিনিই করেছেন, করিয়েছেন। কিন্তু সেরকম নিশ্চয়ই বাস্তবে ঘটবে না। তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতেও এ কথা বলাই যায় যে, কাজটি জঘন্য অন্যায় হয়েছে, ইসলাম পরিপন্থী হয়েছে। যে হুজুগ থেকে এমন একটা অন্যায় হতে পারে, সেই হুজুগটিকেও নিশ্চয়ই ইসলাম অনুমোদন করবে না। কাজেই যদি এটিকে গণপিটুনি বলি, পুরো এলাকার সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে হয়েছে বলে মানি, তাহলে এটাও মানতে হবে ওই গণপিটুনিতে অংশ নেওয়া প্রত্যেকটা মানুষ ইসলামবিরোধী কাজ করেছেন। একটি মানুষকে হত্যার অপরাধ তারা সকলেই করেছেন। এটা ইসলামের দৃষ্টিতেও অপরাধ, রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের দৃষ্টিতেও অপরাধ। এখন শাস্তিটা হওয়া দরকার, যথাসম্ভব দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার।

এখানে আর একটি বিষয় লক্ষণীয়। এইসব জঙ্গি বা ধর্মের অপব্যবহারকারী, সাধারণ মানুষকে এত সহজেই কীভাবে উত্তেজিত করতে পারছে? তাহলে কি এদের বিপরীতে প্রকৃত ধার্মিকদের সংখ্যা খুবই কম, তারাই সংখ্যালঘু। বলা হয়ে থাকে- ইসলাম হচ্ছে শান্তির ধর্ম। জুয়েল বা জোবায়ের শান্তির কোন পরশটা পেল? একটা মানুষকে জীবন্ত অথবা মৃত আগুনে পোড়ানোর মতো হিংস্রতা যারা দেখাতে পারল, তারাই বা কোন বিচেনায় নিজেদেরকে শান্তির ধর্মের অনুসারী বলে দাবি করতে পারবে? এরা কি আসলে ইসলামের নামে ইসলামবিরোধী কাজই করছে না?আর এত কিছুর বিপরীতে একবার ভাবুন তো জুয়েল সাহেবের পরিবারটির কথা। তার স্ত্রী, কন্যা, পুত্রের কথা। পারিবারিক সংকটের পাশাপাশি সমাজেও কি তারা অসহনীয় একটা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়বে না? তার মেয়েটি কি আর আগের মতো সাবলীলভাবে কলেজে যেতে পারবে, সহপাঠীদের সঙ্গে মিশতে পারবে? ‘ইসলাম অবমাননাকারীর’ সন্তান হিসাবে কি তাদের অদ্ভুত এক পরিচিতি জুটবে না? এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে রক্ষার জন্য হলেও রাষ্ট্রের এখন উচিত অতিদ্রুত অপরাধীদের চিহ্নিত করা, তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া। জনগণের মধ্যে এমন বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া- ওই গণপিটুনিতে যারা অংশ নিয়েছে, জুয়েলকে যারা আগুনে পুড়িয়েছে, তারা আসলে ইসলামবিরোধী কাজ করেছে।

মাসুদ কামাল: সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.