বুদ্ধিজীবী হত্যাঃ মননের কৃষ্ণপক্ষ

ওবাইদুর সাঈদ
১৭৫৭ সালে স্বাধীন  বাংলার আকাশের শেষ সূর্যটি সেই অস্তমিত হলো যা আবার দেখা মেলে প্রায় ২০০ বছর পর পাকিস্তান ভারত দুটি ভিন্ন জাতির দেশের জন্মের মাধ্যমে ১৯৪৭ সালে । বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে পাকিস্তানের অধিনে চলে যায়। এ অধীনতা যেন আরেকবার স্বাধীন বাংলার অস্তমিত সূর্য। পাকিস্তান জন্মের পর থেকেই ক্ষমতাশীলদের দ্বারা পূর্ব পাকিস্তান সব দিক থেকেই বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। প্রথমে মাতৃভাষা কেড়ে নেয়ার ঘৃণ্য অপচেষ্টা।  অতঃপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ।একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

দেশের মেধাকে শানিত করেন। দেশের মেধাকে কাজে লাগান। দেশের মেধা সম্পদ কে কাজে লাগিয়ে দেশকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেন তারাই হলেন বুদ্ধিজীবি।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী যারা দৈহিক শ্রমের বদলে মানসিক শ্রম বা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম দেন তারাই বুদ্ধিজীবী।

২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনার সাথে একসাথেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে ২৫শে মার্চের রাতেই হত্যা করা হয়। তবে, পরিকল্পিত হত্যার ব্যাপক অংশটি ঘটে যুদ্ধ শেষ হবার মাত্র কয়েকদিন আগে।  ধারণা করা হয় পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে এ কাজের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তৎকালীন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি। কারণ স্বাধীনতার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত বঙ্গভবন থেকে তাঁর স্বহস্তে লিখিত ডায়েরি পাওয়া যায়। এতে অনেক নিহত ও জীবিত বুদ্ধিজীবীর নাম পাওয়া যায়। আইয়ুব শাসনামলের তথ্য সচিব আলতাফ গওহরের এক সাক্ষাৎকার হতে জানা যায়, ফরমান আলীর তালিকায় তাঁর বন্ধু কবি সানাউল হকের নাম ছিল। সন্দেহ করা হয় পুরো ঘটনার পরিকল্পনায় সিআইএ’র ভূমিকা ছিল। কারন তাঁর ডায়েরিতে হেইট ও ডুসপিক নামে দুজন মার্কিন নাগরিকের কথা পাওয়া যায়। দুজনেই মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করতেন
পাকিস্তান নামক অগণতান্ত্রিক এবং অবৈজ্ঞানিক রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই বাঙালিদের বা পূর্ব-পাকিস্তানীদের সাথে পশ্চিম-পাকিস্তানের রাষ্ট্র-যন্ত্র বৈষম্যমূলক আচরণ করতে থাকে। প্রথমেই  তারা বাঙালিদের ভাষা ও সংস্কৃতির উপর আঘাত হানে।  ফলশ্রুতিতে বাঙালির মনে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে এবং বাঙালিরা এই অবিচারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু করে। এ সকল আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকতেন সমাজের সর্বস্তরের বুদ্ধিজীবীরা। তারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক-ভাবে বাঙালিদের বাঙালি জাতীয়তা-বোধে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফলেই জনগণ ধীরে ধীরে নিজেদের দাবি ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে থাকে যা পরবর্তীতে তাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে। এজন্য বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন। তাই যুদ্ধের শুরু থেকেই পাকিস্তানী বাহিনী বাছাই করে করে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। এছাড়া যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যখন পাকিস্তানের পরাজয় যখন শুধু সময়ের ব্যাপার তখন বাঙালি জাতি যেন শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে তাই তারা বাঙালি জাতিকে মেধা-শূন্য করার লক্ষ্যে তালিকা তৈরি করে করে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে।

এটা সুস্পষ্ট যে, বুদ্ধিজীবীরাই জাগিয়ে রাখেন জাতির বিবেক, তুলে ধরেন তাদের রচনাবলির মাধ্যমে, বক্তৃতার মাধ্যমে,  সাংবাদিকদের কলমের মাধ্যমে, গানের সুরে, শিক্ষালয়ে পাঠদানে, চিকিৎসা, প্রকৌশল, রাজনীতি ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের সান্নিধ্যে এসে। একটি জাতিকে পঙ্গু  করার প্রথম উপায় বুদ্ধিজীবীশূন্য করা।  ২৫ মার্চ রাতে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী স্বাধীনতা বিরোধী আল বদর আল শামস এর সহায়তায় স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজয় অনিবার্য জেনে ডিসেম্বরের ১০  হতে ১৪  তারিখে দেশের সূর্য সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে।
বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর সকল বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে। ১৪ ডিসেম্বর সবচেয়ে বেশি হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করতে পরিকল্পিতভাবে দেশের অসংখ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকদের চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে তাদের নির্যাতনের পর হত্যা করে।৷

হানাদারেরা শুধু বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে ক্ষান্ত হয়নি।
অনেকের দেহে ছিল আঘাতের চিহ্ন, কারো বাবা শরীরে একাধিক গুলি, অনেককে হত্যা করা হয়েছিল ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর মিরপুর ও রাজারবাগ বধ্যভূমিতে বুদ্ধিজীবীদের মৃতদেহ সনাক্ত করা হয়।

মূলত কত জন বুদ্ধিজীবিকে হত্যা করা হয়েছিল তার সঠিক তথ্য নেই। ১৯৯৪ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত ‘শহিদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ’ উল্লেখ আছে ২৩২ জন বুদ্ধিজীবী নিহত হয়েছেন। তালিকায় অসম্পূর্ণতার কথাও  স্বীকার করা হয়েছে এই গ্রন্থে।

১৯৭২ সালে  আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন ‘নিউজ উইক’-এর সাংবাদিক নিকোলাস টমালিনের লেখা থেকে জানা যায়, মোট ১ হাজার ৭০ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল।
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রয়েছেন- অধ্যাপক মুনির চৌধুরী, ডা. আলিম চৌধুরী, অধ্যাপক মুনিরুজ্জামান, ড. ফজলে রাব্বী, সিরাজ উদ্দিন হোসেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, অধ্যাপক জিসি দেব, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সাংবাদিক খন্দকার আবু তাহের, নিজামউদ্দিন আহমেদ, এসএ মান্নান (লাডু ভাই), এ এন এম গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ নাজমুল হক, সেলিনা পারভিনসহ আরও অনেকে।

বুদ্ধিজীবী হত্যা নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তা আলোর মুখ দেখে নি। “বুদ্ধিজীবী তদন্ত কমিটি” গঠিত কমিটির প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়, রাও ফরমান আলী এদেশের ২০,০০০ বুদ্ধিজীবীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এই পরিকল্পনা মতো হত্যাযজ্ঞ চলেনি। কারণ ফরমান আলীর লক্ষ্য ছিল শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের গভর্নর হাউজে নিমন্ত্রণ করে  হত্যা করা। বুদ্ধিজীবী তদন্ত কমিটির প্রধান জহির রায়হান বলেছিলেন, ‘এরা নির্ভুলভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনষ্ক বুদ্ধিজীবীদেরকে বাছাই করে আঘাত হেনেছে’। তদন্ত কমিটির প্রধান জহির রায়হান ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি নিখোঁজ হন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন বধ্যভূমি খোঁজার জন্য ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ডিসেম্বরের পর থেকে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে “ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি”। এ যাবত সারা দেশে প্রায় ৯৪২টি বধ্যভূমি শনাক্ত করতে পেরেছে তারা। স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন প্রকাশিত পত্রিকা, এ বিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধ, গ্রন্থ, এবং  মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার এবং স্থানীয় লোকজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব বধ্যভূমি খুঁজে আবিষ্কার করা হয়। অধিকাংশ জেলাতেই মুক্তিযুদ্ধের বধ্যভূমিগুলো  রেল নয়তো সড়ক ও জনপথের আওতাভুক্ত জায়গায়।

স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে ২০১৩ সালে  মুক্তিযুদ্ধকালে শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বিচারিক কার্যক্রম শুরু। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’১৯৭৩ তথা যুদ্ধাপরাধ আইনের আওতায় বুদ্ধিজীবীদের খুনি বলে অভিযুক্ত করা হয়।
একাত্তরের ১০ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ১৮ জন বুদ্ধিজীবীকে অপহরণের পর হত্যার দায়ে তাঁদের চৌধুরী মুঈনুদ্দীন  ও আশরাফুজামান খান কে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এ দুজনের ফাসি কার্যকরের মাধ্যমে জাতি তাদের সূর্য সন্তানদের গণ হারে হত্যার বিচার পায়।

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ১৪ ডিসেম্বরকে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ ঘোষণা করেন।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস বাংলাদেশে পালিত একটি বিশেষ দিবস। প্রতিবছর বাংলাদেশে ১৪ ডিসেম্বর দিনটিকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। শহীদ বুদ্ধিজীবীরা থাকবে বাঙালি জাতির মননে কৃষ্ণপল্লবের ন্যায় কৃষ্ণ পক্ষ হয়ে।

লেখকঃ শিক্ষার্থী ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.