ভাষা আন্দোলন ও কুড়িগ্রাম

লেখক : মোঃ ফেরদৌস আলম:

পাট,আঁখ ও ভাওয়াইয়া গান আর তিস্তা,ধরলা,ব্রহ্মপুত্র প্রভৃতি ১৬টি নদ-নদী বিধৌত দেশের উত্তর জনপদের জেলা কুড়িগ্রাম।অন্যসব জেলার মত এই জেলার ঐতিহ্য-ইতিহাস গৌরবময় ও সমৃদ্ধপূর্ণ।

২২ এপ্রিল ১৯৭৫খ্রিঃ ৮টি থানা নিয়ে গঠিত হয় কুড়িগ্রাম মহকুমা।১৯৪৭খ্রিঃ ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত পর মহকুমা বিলুপ্ত করে সার্কেল গঠিত হয়।কিন্তুু ১৯৭১ বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর পাকিস্তানি প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে বঙ্গবন্ধু সমগ্র দেশকে  জানুয়ারি’ ১৯৭৫ খ্রিঃ ৬১টি জেলায় প্রবর্তন কালে কুড়িগ্রাম প্রথম জেলায় উন্নীত হয়।তবে,মোশতাক সরাকার বঙ্গবন্ধু প্রবর্তিত জেলা ব্যবস্থাকে বিলুপ্ত ঘোষনা করলে কুড়িগ্রাম পুনরায়  মহকুমায় রুপান্তরিত হয়।
২৬জানুয়ারি’১৯৮৪খ্রিঃ সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ নীতিতে কুড়িগ্রাম পুনরায় জেলায় উন্নীত লাভ করে।১৯৮৪ থেকেই কুড়িগ্রাম জেলা হিসাবে আসীন।বর্তমান ৮৭০ বর্গমাইল এবং ৯টি উপজেলা বিদ্যমান।
ভারত আমল থেকেই এই জানপদের জনগন যেমন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন,কৃষক বিদ্রোহ আন্দোলন,নীল বিদ্রোহ আন্দোলন করেছে,তেমনি ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলনে বীরত্ব দেখিয়েছে,ঝড়িয়ে তাঁজা প্রাণ।
১৯৪৭ খ্রিঃ ভারত বিভক্তের পর পাকিস্তান অধিরাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৫৬% বাংলা   এবং ৪৪%  উর্দু ও অন্যান্য ভাষাভাষী হওয়া সত্ত্বেও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার লক্ষ্যে পাকিস্তানের উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তারা গোপন প্রচেষ্টা শুরু করে।পাকিস্তানের গোপন ষড়যন্ত্র ও হঠকারী সিদ্ধান্তে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ শুরু করে বাংলাভাষা প্রেমীরা।
১৯৪৭ সালের ১সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  তমদ্দুন মজলিস প্রতিষ্ঠিত হয়।ফেব্রুয়ারি’১৯৪৮খ্রিঃ ইংরেজি ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র  ভাষা অনুমোদন করে।কুড়িগ্রামের কৃতিসন্তান কাজী এমদাদুল হক পশ্চিম পাকিস্তানের এই হীন চক্রান্তের কথা জনসম্মুখে তুলে ধরেন।
১৯৪৮ সালে ২ মার্চ এক যৌথসভা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ সম্প্রসারণ করে প্রথম সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।সভায় ৭মার্চ ঢাকায় এবং ১১মার্চ সাড়া দেশে হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়।হরতালে পুলিশ লাটিচার্জ ও কিছু আন্দোলন কর্মীদের গ্রেফতার করেন।সংগঠনটি বন্দিমুক্তি ও রাষ্ট ভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন চালাতে থাকে।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ২১মার্চ ‘৪৮ রেসকোর্স ময়দান ও ২৪মার্চ’৪৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঘোষনা করেন যে,”উর্দু এবং উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।এই বক্তব্যে ছাত্র-শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মানুষ বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হয় এবং না-না ধ্বনিতে প্রতিবাদ শুরু করে।
সাড়া দেশের ন্যায় কুড়িগ্রামেও কাজী এমদাদুল হক সভাপতি ও আব্দুল হাফিজকে সাধারণ সম্পাদক করে কুড়িগ্রাম পাবলিক লাইব্রেরিতে গঠিত হয় সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদ স্থানীয় কমিটি।এই সংগঠনটি কুড়িগ্রামজুড়ে বাংলা ভাষা আন্দোলনকে উজ্জীবিত করে।
মে’৪৮ মৌলানা ভাষানী কুড়িগ্রাম সফর ও সমাবেশ করেন।মৌলানা ভাষানীর জ্বালাময়ী বক্তব্য আন্দোলন কর্মীদের উৎসাহ এবং দিকনির্দেশনা  স্থানীয় এ কমিটির কাজকে আরো বেগবান করে তুলে।সমগ্র দেশের  মত কুড়িগ্রামেও ভাষা আন্দোলনের পক্ষ-বিপক্ষের গোষ্টি ছিলো।
আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ,ছত্রযুবক ও সাধারণ জনগন ভাষা আন্দোলনের পক্ষে থাকলেও পনির উদ্দিন,মনসুর  মোক্তার ও তার সহচর বিপক্ষে ছিলো।কুড়িগ্রামে পালাগান,যাত্রাপালা ও নাট্যদল প্রভৃতি সংগঠনগুলো আন্দোলনে প্রসংসিত ভূমিকা পালন করেছিলো।
১৯৫২ খ্রিঃ খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকা পল্টন ময়দানে বলেন যে,’উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’।এবার আন্দোলনের তীব্রতা বেড়ে যায়।রাষ্টভাষা সুপ্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যেতে ভাষা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ঘোষনা করেন।সাড়া দেশে ২১ফেব্রুয়ারি হরতাল আহ্বান করা হয়।
২১ফেব্রুয়ারি হরতালের কর্মসূচি হিসাবে সকাল ১০টায় কুড়িগ্রাম হাই স্কুল থেকে মিছিল বের হয়।প্রথম দিকে পুলিশ বাধা দেয়ার চেষ্টা করলেও শেষপর্যন্ত বাধা দেয়নি।মিছিলটি গোটা শহর প্রদক্ষিণ শেষে কুড়িগ্রাম হাই স্কুল মাঠে সমাবেশ করে।
সকলেই উদ্বিগ্ন যে,ঢাকা কি ঘটল!! তৎকালিক সময়ে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামে সংবাদপত্র পৌঁছতে প্রায় ৩০-৩২ঘন্টা সময় লাগত।ফলে,ঢাকায় ২১ ফেব্রুয়ারির নির্মম ঘটনা জানতে পারে ২৩ ফেব্রুয়ারি।ঢাকায় নির্মম হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ ও রাষ্টভাষা বাংলার দাবিতে আব্দুল হামিদ,আব্দুল আহাদ ও বাকী হেল,বাদল রুদ্র প্রমূখের নেতৃত্বে  কুড়িগ্রামে ছাত্র-শিক্ষক,আইনজীবী ও বিভিন্ন পেশা শ্রেণীর মানুষ রাস্তায় নামে।সাড়া শহর প্রদক্ষিণ শেষে কুড়িগ্রাম পাবলিক লাইব্রেরির মাঠে শেষ হয়।
২৪ফেব্রুয়ারি কুড়িগ্রাম হাইস্কুল মাঠে সমাবেশ হয়।২৫ফেব্রুয়ারি হরতাল আহ্বান করা হয়।পনির উদ্দিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী মিছিলটি দাদামোড়ে পৌঁছতেই তার সহচর আন্দোলনকারীদের উপর আক্রমণ চালায়,আন্দোলন কর্মীদের তীব্র প্রতিরোধে পশ্চাৎপথ গ্রহনে বাধ্য হয়।
পনির উদ্দিন থানা গিয়ে নালিশ করেন যে,আন্দোলনকারীরা দোকানের মালামাল-অর্থ লুট করেছে।কর্তব্যরত দারোগা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রথমত মামলা না নিতে চাননি,কিন্তুু পনির উদ্দিনের চাপে মামলা গ্রহন করে।পনির উদ্দিন ফোন করেন রংপুর পুলিশ সুপারের কাছে,ছাত্রদের গ্রেফতার করারতে।বাঙালি পুলিশ সুপার বলেন,এসময় ওদের না ক্ষেপানোই ভালো।
কিছু দিন পর মুসলিম লীগের সাথে ভাষা আন্দোলন কর্মীদের সংঘর্ষ হয়।ঘটনাস্থলে পুলিশ লাটিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে।থানায়  মামলা হয়।পুলিশ আন্দোলন কর্মীদের বাড়িতে রেড দেয়া শুরু করে,বাদল রুদ্র ধরা পরেন।দু’দিন জেল বন্দির পর আইনজীবীরা তাাকে মুক্ত করেন।
‘৫২-এর ভাষা আন্দোলন ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রতিক ‘শহীদ মিনার’।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩ফেব্রুয়ারি রাতারতি শহিদ মিনার গড়ে উঠলেও,কুড়িগ্রামে ছিলো তার ব্যতিক্রম।১৮ফেব্রুয়ারি’ ১৯৫৩ খ্রিঃ তৎকালিন থানার সামনে কাঁদা মাটি দিয়ে ইট গেঁথে কয়েক ধাপ নিয়ে শহিদ মিনার নির্মিত হয়।২০ফেব্রুয়ারি চুন দিয়ে রং করা হয়,২১ ফেব্রুয়ারি কুড়িগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ ভাষা শহীদদের সম্মান প্রদর্শনের জন্য নব নির্মিত শহীদ মিনারে প্রত্যুষে ছুটে আসে।২০ফেব্রুয়ারি’১৯৬৩খ্রিঃ মজিদা কলেজ কংক্রিটের শহিদ মিনার নির্মান করা হয়।কিন্তুু দিন শেষে পুলিশ তা ভেঙ্গে দিয়ে যায়।তৎক্ষানিক সিদ্ধান্তে রাতা-রাতি পুনরায় শহিদ মিনার নির্মান করা হয়।১৯৭১ খ্রিঃ স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকবাহিনীর গোলীতে শহিদ মিনারটি ধ্বংস হয়।১৯৮৫খ্রিঃ সৈয়দ মনসুর আলী টিংকু (বীর বিক্রম) কুড়িগ্রাম ঘোষপাড়ায় নির্মান করে   কুড়িগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।এই শহীদ মিনার কমপ্লেক্সে রয়েছে জাতীয় ফুল পদ্মাও পানির ফোয়ারা।কুড়িগ্রাম জেলার ৯টি উপজেলা সদরে রয়েছে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার।প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় আন্তর্জাতিক এই মাতৃভাষা দিবস।
লেখক : মোঃ ফেরদৌস আলম
উলিপুর,কুড়িগ্রাম

Leave a Reply

Your email address will not be published.