সমৃদ্ধির যে পর্যায়ে দেশ

হীরেন পণ্ডিত :

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, আমাদের মহানায়ক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, আরো কত-কি! যাঁর জন্ম না হলে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেতাম না।

নিজে স্বাধীনচেতা ছিলেন বলেই দেশকেও স্বাধীন করেছেন নিজ উদ্যাগে এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বে। তিনি মানুষের মাঝে আত্মসচেতনতা সৃষ্টি করেছেন, স্বাধিকার আন্দোলনের চেতনা এবং বীজ দুটোই ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন সমস্ত বাঙালির মনে। অধিকার চেতনাবোধ জাগ্রত করেছেন।

মানুষের মনে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছেন। বারবার কারাবরণ করেছেন। কিন্তু কোনো লোভ-লালসার কাছে মাথা নত করেননি, আত্মসমর্পণ করেননি। বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ- এ দুটো প্রত্যয়, দুটি শব্দ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালে এই ক্ষণজন্মা মহান পুরুষের কালজয়ী, বলিষ্ঠ ও গতিশীল নেতৃত্বেই বাঙালি জাতি মুক্তির স্বাদ লাভ করেছিল।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে দেখা যায়, যেসব মহান নেতা পৃথিবীর কোনো জাতির মুক্তির জন্য নেতৃত্ব দিয়েছেন- তারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের অন্তর্ভুক্ত থেকেই সেই মহান কাজটি করেছেন; তবে সে জন্য তারা পরবর্তী সময়ে শুধু সেই নির্দিষ্ট দলের সংকীর্ণ পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেননি বরং সামগ্রিকভাবে সেই জাতি তাকে স্থান দিয়েছে সব ধরনের দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সর্বজনীনভাবেই সবার শীর্ষে। একইভাবে বঙ্গবন্ধুকেও আজ আর কোনো বিশেষ দলীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখা যায় না- বঙ্গবন্ধু সবার, শুধু এই বাঙালি জাতি কিংবা বাংলাদেশ নয়; আজ সারা বিশ্বের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু একটি অজেয়, অক্ষয় নাম! তাঁর মতো তেজোদীপ্ত অসীম সাহসী নেতা সারা বিশ্বের ইতিহাসে সত্যি বিরল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতিসত্তার এক মহান নির্মাতা। এ জন্যই বোধ হয় বিদেশিরা বঙ্গবন্ধুকে অভিহিত করে থাকেন ‘ফাউন্ডিং ফাদার অব দ্য নেশন’ হিসেবে। বাঙালি জাতিসত্তার নির্মাতা তিনিই।

বাংলাদেশের আজ নানা ক্ষেত্রে আমাদের অনেক অর্জন! বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক হিসেবে বিশ্বব্যাপী আমাদের যে অবাধ বিচরণ, পারিপার্শ্বিক নানা প্রতিকূলতা দূর করে উন্নয়নের মহাসড়কে আমাদের আজ যে দৃপ্ত পদচারণা, তার সবই বঙ্গবন্ধুর অবদান। আমরা যদি একটি স্বাধীন দেশ না পেতাম তাহলে আজও পাকিস্তানের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতো, নিষ্পেষিত হতে হতো। স্বাধীন দেশ পেয়েছি বলেই আমরা স্বাধীনভাবে সবকিছু চিন্তা করতে পারি। সমাজ ও অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে আমাদের সাফল্য বিশ্ববাসীর বিস্ময়মুগ্ধ মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে, তা বঙ্গবন্ধুর কল্যাণেই সম্ভব হয়েছে। বলা বাহুল্য, এ সবই সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার কল্যাণে। স্বাধীনতার মহান স্থপতি হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু যে সম্ভাবনার অসীম সেই দিগন্ত উন্মোচন করেছেন তা-ই নয়, একই সঙ্গে হতাশাক্লিষ্ট জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছেন ভয়কে জয় করার জন্য, মৃত্যুঞ্জয়ী মন্ত্রেও দীক্ষিত করেছেন পুরো জাতিকে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশের সর্বত্র ছিল নানাবিধ সংকট। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে পুনর্গঠনের কাজে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেন আপন মহিমায়। অভাব আর হাহাকারের ভারী বাতাসে মানুষ যখন হাঁসফাঁস করছিল, তখন জাতির পিতা দেশে ফিরে হাল ধরলেন দক্ষ নাবিকের মতো। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে পুনর্গঠনের কাজে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেন আপন মহিমায়। চারদিকে বইয়ে দিলেন শান্তির সুবাতাস। নিদারুণ সংকট থেকে মুক্তির জন্য ব্যাপকভিত্তিক প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাংলাদেশের নেতা ছিলেন না, তিনি সমগ্র বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের নেতা ছিলেন। বিশ্বের বঞ্চিত জনগোষ্ঠী তাদের আজীবন প্রাণশক্তির জন্য যেকোনো সংকটে বঙ্গবন্ধুকে খুঁজবে।

আমাদের একটি কথাই বারবার মনে হয়, যা বাঙালি জাতির যখন যা কিছু অর্জন, অনেক ত্যাগের মধ্য দিয়ে, অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আমাদের অর্জন করতে হয়েছে। সেই অর্জনগুলো আমাদের ধরে রাখতে হবে। কোনো মতেই যেন এই অর্জন কেউ ভবিষ্যতে নস্যাৎ করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর এক যুগ ধরে দেশশাসন করছে। অবশ্য ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর এক মেয়াদ ক্ষমতাসীন ছিল স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী ঐতিহ্যবাহী দলটি। ২০০৯ সাল থেকে পরপর দুই মেয়াদ দেশ শাসন করতে পারায় দেশের উন্নয়নে আত্মবিশ্বাস জন্মেছে আওয়ামী লীগের এবং ক্রমান্বয়ে উন্নতি হচ্ছে।

আমাদের দেশে কৃষিবিপ্লবের কারণেই ১৬ কোটি মানুষের দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা গেছে, যা দেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক। আজকের এই কৃষিবিপ্লবের শতভাগই আওয়ামী লীগের উদ্ভাবন।

বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু থেকে বরাদ্দ বাতিল করলে আওয়ামী লীগ সরকার সেটাকে চ্যালেঞ্জরূপে গ্রহণ করে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তায় পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে। গত ডিসেম্বরে বিজয়ের মাসেই সর্বশেষ স্প্যান বসেছে এবং আগামী বছর সেটি জনগণের জন্য খুলে দেয় হবে। কয়েক বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার অবকাঠামো নির্মাণে ব্রতী হয়েছে। ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস, ও মেট্রোরেল ইত্যাদি নির্মাণ করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের বিশাল কর্মযজ্ঞ সামনে রেখেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছেন, এই লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার।

শিক্ষা, যোগাযোগ অবকাঠামো, গ্যাস, বিদ্যুৎ, নারীশিক্ষা, চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা শতভাগ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা, বিনামূল্যে বই বিতরণ, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, সামাজিক কর্মসূচির আওতায় পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী, অসহায়, বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী, স্বামী পরিত্যক্তা, অটিজম, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা প্রদান, আশ্রয়ণ প্রকল্প, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, নারীর ক্ষমতায়নসহ ও বিভিন্ন সেক্টরের সামগ্রিক উন্নয়নের সুফল জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে এবং জনগণকে বোঝাতে হবে। একমাত্র বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই সেই সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছি। আমরা বিজয়ী জাতি। বিজয়ী জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে কারো কাছে আমরা মাথা নত করব না। আমাদের যতটুকু সম্পদ, যেটা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বারবার বলেছেন, সেই সম্পদটুকু কাজে লাগিয়েই আমরা বিশ্বসভায় আমাদের নিজেদের আপন মহিমায় আমরা গৌরবান্বিত হব, নিজেদের গড়ে তুলব এবং সারা বিশ্বের কাছে আমরা মাথা উঁচু করে চলব। এটাই হবে এ দেশের মানুষের জন্য সবদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এভাবেই এগিয়ে যাবে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ তাঁর সুযোগ্য কন্যার হাত ধরে আজ উন্নয়নের রোল মডেল।

লেখক: প্রাবন্ধিক

ই-মেইল: hirenpandit01@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published.