তারাগঞ্জে বিআরডিবি প্রশিক্ষণে সরকারি টাকা গচ্ছা মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত

দিপক রায়, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি :

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় পল্লী উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক উত্তরাঞ্চলের হতদরিদ্রদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে (উহদকনিক) ও একই উপজেলার উদকনিক প্রকল্পে সরকারের দেওয়া মোট ২ কোটি ৮৮ লক্ষ ১০ হাজার ৪৮০ টাকা দুইটি প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হলেও উক্ত প্রকল্পের প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য সফল না হওয়ায় সরকারের দেওয়া বরাদ্দকৃত অর্থ গচ্ছা গেছে।

তথ্য অধিকার আইনে প্রাপ্ত প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০০৮ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত উহদকনিক প্রকল্পে ১ কোটি ১৬ লক্ষ ৭৭ হাজার ১০০ টাকা এবং উদকনিক প্রকল্পে ১ কোটি ৭১ লক্ষ ৩৩ হাজার ৩৮০ টাকা বরাদ্দ দেয় প্রকল্প পরিচালক বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড ঢাকা।

উক্ত দুটি প্রকল্পে মোট ১ হাজার ৯৬৪ জন প্রশিক্ষণ নেয়। প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল হতদরিদ্র পরিবারের মাধ্যমে বেকার যুবক-যুবতীদের ৪টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলা।

ট্রেড ৪টি হলো সেলাই, এ্যামব্রয়ডারি, শতরঞ্জি ও বাটিক-বুটিক।

সরেজমিনে উক্ত ট্রেডগুলো থেকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত উত্তর হাজিপুর গ্রামের সালেহা পারভীন, দক্ষিণ হাজিপুর গ্রামের শিল্পী রানী, জগদীশপুর গ্রামের রশিদা, খাদিজা, মাহমুদা, লক্ষিপুরের তানজিনা বেগম, কাচনার শেফালী রানী, জবা রানী, সয়ারের প্রতিমা রানী, মারুফা, তারামিনা, সোহাগী, সুমি আক্তার, কুর্শা ইউনিয়নের দুলালী পারভীন, লাভলী, ফুলমতি, সালমা, নাজমা বেগম, আলমপুর ভীমপুরের আদুরী, আমিনা, সবিতা রানী, হাড়িয়ারকুঠির আঞ্জুয়ারা, ফরিদা বেগমসহ বেশ কয়েক জনের বাড়িতে ঘুরে দেখা গেছে প্রশিক্ষণ পাওয়ার আগে থেকেই তারা স্বচ্ছল।

পারিবারিকভাবে আগে থেকেই স্বচ্ছল হওয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা কোন কর্মের সাথে জড়িত নয়। প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর প্রকল্পটি থেকে সেলাই মেশিন বা নগদ অর্থ পাওয়ার লোভেই তারা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। তবে প্রশিক্ষণার্থীদের দেওয়ার জন্য প্রকল্পটিতে যে সমস্ত সেলাই মেশিন ক্রয় করা হয়েছে তা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে নিম্ন  মানের মেশিন ক্রয় করে প্রশিক্ষণার্থীদের বিতরণ করে সেখান থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করেছে।

বিভিন্ন সময় তদন্ত হলে তারা ইকরচালী ইউনিয়নের প্রামাণিক পাড়ার ২ থেকে ৩ জন এবং কুর্শা ইউনিয়নের দোলাপাড়ার দুই একজনকে দেখিয়ে নিয়ে আসে। একাধিক প্রশিক্ষণার্থী অভিযোগ করে বলেন, আমাদের শারিরীক সমস্যার কারণে মাঝে মধ্যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে না গেলে সেই দিনের টাকা কর্তন করা হয় এবং উক্ত টাকা কেটে নিয়ে নিজেই পকেটস্থ করেন বিআরডিবি কর্মকর্তা।

আলমপুর ইউনিয়নের প্রশিক্ষণার্থী মুক্তা বেগম জানান, আমি গর্ভবতী হওয়ায় ১৬ দিন প্রশিক্ষণের যেতে পারিনি। ডাক্তার আমাকে বাইরে বের হতে নিষেধ করেছিল। আমি বিষয়টি উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়কে অবগত করি। তিনি আমাকে প্রশিক্ষণে আসতে নিষেধ করেন। অথচ বিআরডিবি কর্মকর্তা আমার কাছ থেকে জোর করে স্বাক্ষর নিয়ে ১৬ দিনের সম্পুর্ণ টাকা কেটে নিয়ে বাকি টাকা আমার হাতে ধরিয়ে দেয়। আমি প্রতিবাদ করলে তিনি উক্ত টাকা সরকারের কোষাগারে ফেরত দিবেন বলে জানান। পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি প্রশিক্ষণার্থীদের টাকা তিনি ফেরত না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। অনেক প্রশিক্ষণার্থীর অভিযোগ রয়েছে তাদের অনুপস্থিতির টাকা কর্তনের বিষয়ে।

সয়ার ইউপি সদস্য মমিনুর রহমান বলেন, বারবার উপজেলা প্রশাসন লটারির নিয়ম করলেও তারা নির্দিষ্ট কয়েকজন দালালের মাধ্যমে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা নিয়ে স্বচ্ছল পরিবারের সদস্যদের নির্বাচন করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দেয়। তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানান জটিলতা।

তথ্য চেয়ে আবেদন করলে উক্ত কর্মকর্তা বিভিন্ন দলীয় লোকজনের মাধ্যমে তথ্য আবেদনকারী রংপুরের জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল “রংপুর টাইমস” এর তারাগঞ্জ প্রতিনিধিকে আবেদনটি তুলে নিতে প্রথমে টাকার লোভ দেখানো হয়। এতে তিনি রাজি না হওয়ায় তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শণ করেন। এতেও ওই প্রতিনিধি আবেদনটি তুলে না নেওয়ায় তথ্যের ফটোকপি বাবদ ২ হাজার ১৫৬ টাকার বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়। যদিও ওই তথ্যের আপীল আবেদনে জেলা প্রশাসক মাত্র দুই পৃষ্ঠার কাগজে ওই সকল তথ্য প্রদান করেন।

পারিবারিকভাবে স্বচ্ছল নারীদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে জানতে উপজেলা বিআরডিবি কর্মকর্তা মমিনুল ইসলামের অফিসে গিয়ে তাকে না পেয়ে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, উপজেলা বাছাই কমিটি যাদের নাম বাছাই করে আমাদের কাছে পাঠায় আমরা তাদেরই প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। আমরা কাউকে বাছাই করি নাই। অনুপস্থিতের টাকা কর্তন প্রসঙ্গে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, অনুপস্থিতির কোন টাকা কর্তন করার নিয়ম নেই। আর কিছু বলতে পারবো না আমি।

 

এ বিষয়ে কথা বলতে তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমিনুল ইসলামের অফিসে গেলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে পরে দেখা করতে বরেন এ প্রতিবেদককে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.