স্মৃতিকথাঃ এরোডাইনামিক্সের স্যার

এ কে সরকার শাওন:
রংপুরে মিঠাপুকুরের মিষ্টি মুখ প্রিয় মতিউর স্যারকে ফেসবুকের কল্যাণে প্রায় দুই যুগ পরে পেয়ে গেলাম গত সাপ্তাহে। কর্মপ্রিয় প্রিয় এই মানুষটির দালিলিক নাম শেখ মতিয়ার রহমান।
 
চাকরীর সার্ভিস length হিসাবে আমি অল্প সময় পেরোনোর পরই পেয়েছিলাম মাতুব্বরি ও অল্প বয়সে পেয়েছিলাম মাষ্টারী! এই দুই দপ্তরেই তিনি ছিলেন গুরুসদৃশ্য সহকর্মী!
 
প্রথমটি তদারককারী অফিস রক্ষানাবেক্ষণ নিয়ন্ত্রনে (Maintenance Control Of Aircraft Maintenance )। যার প্রধান অফিস ছিলো পুরাতন বিমান বন্দরের প্রধান বিমান হ্যাঙ্গারে! জাহাঙ্গীর গেট বা থার্ড গেট সংলগ্ন! অন্যটির অফিস চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় Aeronautical Engineering Training Squadron এ।
সেখানে দেশী প্রশিক্ষণার্থীদের (Army, Navy & Air Force) ও বিদেশী প্রশিক্ষণার্থীদের বিমান ও হেলিকপ্টার রক্ষণাবেক্ষণ এর উপর হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দান করা হয় অতি উচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এই দুই দপ্তরেই তাঁকে সহকর্মী পেয়ে গর্ববোধ করতাম। প্রতিটি বিষয়ের syllabi   ও ট্রেনিং ম্যাটেরিয়াল (Percy) ও আমাদেরই লিখতে হতো। তিনি পড়াতেন Aerodynamics.
 
Aerodynamics is that branch of Dynamics which deals with moving object through air, its (air) behavior & characteristics. এটি ছিলো বেশ কঠিন সাবজেক্ট। প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে এই নামে একটি টপিক আছে মাত্র।
 
আমরা যখন প্রশিক্ষনার্থী তখন এই নিরস ও কঠিন বিষয়টি পড়াতেন মাহমুদুল হক স্যার। বাড়ী পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায়। কঠিন বিষয়টি পড়াতেন বলেই তাঁকে কখনো হাসতে দেখিনি। আমরা তাই স্যারকে বলতাম দার্শনিক মাহমুদ স্যার। স্যার পড়ানোর সময় কবীর, কাদের, মফিজ যখন বন্ধু-বান্ধবীর কল্পনায় ক্লাসে খেই হারিয়ে ফেলতো তখন মাহমুদ স্যার বলতেন, Yes, Kader is getting & guessing. I think he has understood my imparting topic in to to.” ক্লাসে আমরা তখন কোনমতে দাঁত, মুখ ও পেট চেপে রাখতাম।
 
আমার ছবি তোলার বাতিক সেই ১৯৮৮ সাল থেকে। সৈকতে, শহরে, পাহাড়ে ঘুরতে গেলে নিজের ক্যামেরা থাকার পরও সুযোগ পেলে সব সময় প্রফেশনাল ক্যামেরাম্যান দ্বারাও ছবি তুলে রাখতাম।  ১৯৯০ সালের একদিন বিকেলে বন্ধুরা মিলে পতেঙ্গা সৈকতে   জলকেলি করছিলাম। হঠাৎ দেখি আমাদের Aerodynamics এর দার্শনিক মাহমুদ স্যার সপরিবারে সূর্যাস্ত দেখতে এসেছেন। এরোডাইনামিক্স পড়িয়ে পড়িয়ে মাথার প্রায় সব চুল হারিয়ে ফেলেছেন। শেষ সম্বল সামনের চুলের গোছাটি দুরন্ত বাতাসে উড়ে হারিয়ে যেতে চাচ্ছিলো তামিলনাড়ুর ধনুসকডিতে। যৌবনে স্যারের মাথায় নাকি অশুরের মত ঝাকড়া চুল ছিলো। কু আর সু যাই হোক কবীরের পরামর্শে স্যারকে গিয়ে বললাম
স্যার, যদি অনুমতি দেন তাহলে আপনার সাথে আমরা ছবি তুলতে চাই।
তার কি কোন আদৌ প্রয়োজন আছে?
বিরস বদনে স্যার বড় বড় চোখ তুলে বললেন।
প্লিজ স্যার, না করবেন না। একটা স্মৃতি রাখি। অনুনয় বিনয় করাতে স্যার রাজী হয়ে বললেন
ওকে তুলুন, হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই আমার হাতে ।
 
অতঃপর বন্ধু সহকর্মীরা স্যারের সাথে ঘেটা ঘেট কয়েকটি ছবি তুলে নিলাম। স্যার রোবটের মত দাড়িয়ে হয়তো এরোডাইনামিক্সের sonic boom ভাবছিলেন কিংবা ফাইটারের স্টলিং এঙ্গেল পরিমাপ করছিলেন।
In photo issue all credit goes to Kader. কবীর পিন মেরে চাপা স্বরে স্বগোতক্তি দিলো।
স্যারের সাথে আরো ক্লোজ হবার মানসে
খুশীতে গদগদ হয়ে বললা;
স্যার, আপনার সাথে ভাবীর দু’টো ছবি তুলে দেই?
না না দরকার নাই। স্যারের সাফ জবাব।
আমি বানিয়ে বানিয়ে গুল মেরে বললাম ত্রিশ চল্লিশ বছর পর পর এমন দৃষ্টি নন্দন বিকেল মেলে স্যার।
আজকের সন্ধ্যাটা দারুণ উপভোগ্য । দেখছেন না কেমন জানি আগুন লাগা লাগা ভাব।
মিস করবেন না স্যার।
ওকে ওকে বলে স্যার ম্যাডামকে ডেকে পাশে দাড় করালেন।
স্যার, পাম্প সু খুলে কষ্ট করে হাটু জলে নামলে ছবিটা ভালো ও প্রানবন্ত হবে।
স্যার ও ম্যাডাম তাই করলেন। ম্যাডামের প্র‍্যাগনেন্সি এডভান্স স্টেজে থাকায় খুব সতর্কতার সাথে কাপড় ভিজিয়ে হাটু পানিতে নেমেছিলেন সুন্দর একটি বিকেলকে স্মৃতিময় করে রাখতে। তখন যদিও আমি সনদধারী ফটোগ্রাফার না তবুও যত রকম ক্যারিশমা দেখিয়ে ছবি তোলা যায় সেটা করে ছবি তুললাম যেন স্যারের হৃদয়ে একটু আঁচড় কাটে। এমন কি পানিতে শুইয়েও সট নিলাম।
 
রুমে আসার পর বিষয়টি নিয়ে সবাই খুব বলা বলি করছে। বিশেষ করে ঠোঁট কাটা ইসকেন্দার তো বলেই ফেললো
এবার প্রাকটিক্যালে তোর মার্ক ৯০% নিশ্চিত! (৯০% এর বেশী কাউকে দেয়া হয় না।) আমি হালকা রেগে উত্তর দিয়েছিলাম আগে কি কারো চেয়ে কম নাম্বার পেয়েছি নাকি!
 
স্যারের সাথে ছবি তুলে আমি খুব খুশী। ইকবাল নাকি জসীমকে দেয়া হলো নেগেটিভ থেকে পজেটিভ ও প্রিন্ট করার জন্য। পরদিন সন্ধার পর চিত্ত বিনোদন হলে ওদের জন্য অপেক্ষা করছি কখন ছবি হাতে আসবে।
একটু পর জসীম মুখ কালো করে এলো।
এতো দেরী করলি। এখন কি স্যারের বাসায় যেতে পারবো? একটু রেগে বললাম।
কাদের শোন, একটা খারাপ খবর আছে! গম্ভীর হয়ে জসীম জানালো।
কি খারাপ খবর? বল!
এক্সিডেন্টাললি রিলের বেশীর ভাগ বার্ণ হয়ে গেছে।
বিশেষ করে মাহমুদুল স্যারের একটা ছবিও টেকেনি!
সেটাই জীবনে রিল সংক্রান্ত প্রথম ও শেষ এক্সিডেন্ট!
মাথায় বাজ পড়লো। আমাদের ছবি নিয়ে কোন ভবনা নাই। কাল ক্লাসে মাহমুদ স্যার ছবি চাইলে কি জবাব দিবো? সেই awful situation ভেবে আমার মুখ পান্ডুর বর্ণ ধারন করলো। হিতে বিপরীত হয়ে গেলো। রেগে প্রাকটিক্যালে ও viva voce তে স্যার কম মার্ক দিয়ে ক্ষোভ ঝাড়ে কি না কে জানে!
 
কবীর মজা নিয়ে উত্তর দিলো Now all discredit goes to Kader.
আমি রাগ করে বললাম তাতেই তোমরা AB অন করে Aerodynamics এ ভর দিয়ে খুশীতে সপ্ত আকাশে উড়ছো!
কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ!
উপায় বাতলে দে দোস্ত! উপায় বাতলে দে !
কবীর কাছে এসে বললো, আরে টেনশন করিস না। স্যার দার্শনিক মানুষ। স্যারের ছবি তোলার কথা মনেই থাকবে না। কাল পরশু তিনদিন তুই লাষ্ট বাট ওয়ান বেঞ্চে বসবি । তোকে দেখলে আবার পাগলারে সাঁকো নাড়ানোর কথা মনে পড়ার মতো হবে। স্যারের ছবির কথা মনে পড়ে যেতে পারে।
 
যেই কথা সেই কাজ পরদিন মাহমুদ স্যারের ক্লাসে সিট প্লান এড়িয়ে লাষ্ট বাট ওয়ান বেঞ্চে বসলাম।
পুরো ক্লাস টাইম মাথা নূইয়ে চুপচাপ পার করলাম। ম্যারাথন ক্লাস । একটানা ৯০ মিনিটের।
স্যার ক্লাস শেষ করে চলে গেলেন।
সবাই খুশীতে লাফালাফি শুরু করলো।
কবীর ক্রেডিট নিয়ে বললো, বলছিলাম না, স্যার দার্শনিক মানুষ। ছবি তোলার কথা মনে থাকবে না।
আমি বললাম বিপদ কিন্তু এখনো কাটেনি দোস্ত!
 
পরের দিনও স্যার ক্লাস নিয়ে চলে গেলেন। আমি হাফ ছেড়ে বেঁচে গেলাম মনে হচ্ছে। কানে ধরলাম জীবনে কোন সিনিয়রকে সেধে ছবি তুলতে বলবো না। চাপমুক্ত হয়ে একটু ফ্রেশ ফ্রেশ লাগছে। তৃতীয় দিনেও শতভাগ নিরাপত্তার জন্য সেই পিছনেই বসলাম। লেসন প্লান অনুযায়ী ক্লাসটি ১০ মিনিট আগেই শেষ করে দিলেন স্যার। ওমনি আমার দিকে নজর স্যারের।
মনে মনে ইষ্টনাম জপতে লাগলাম “লা ইলাহা ইল্লা আনতা….” স্যার প্রশ্নবান ছূড়ে দিলেন
কাদের আপনি পিছনে কেন?
তিন দিন ধরে লক্ষ্য করছি
সিট প্লান এড়িয়ে পিছনের সিটে বসছেন।
আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি অন্য স্যারদের ক্লাসে ঠিকই সামনের সিটে বসছেন।
Anything goes wrong dear?
বিপদে পড়লে, বিগ বস দেখলে এবং রেগে গেলে আমার ইংলিশ ফ্লুয়েন্সি ও মান দু’টোই বেড়ে যায়।
তাই সব জরা ধরা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মাথা উঁচু করে দড়িয়ে স্মার্টলি বলে ফেললাম
Your assumption is right sir.
In fact I’m in trouble & feel ashamed.
But why? sir asked gently.
Our photo shoot reel burned unluckily.
I’m unable to give you photos of that afternoon which involved
nice memory.
স্যার হেসে বললেন
Photo shoot aborted!
That may be. Technology may fail. But you were sincere. You tried your level best. That was the main point to me.
স্যার আমার কাছে এসে “প্যাট অন ব্যাক” দিয়ে বললেন No problem. Don’t worry & forget it. বলেই স্যার ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলেন।
 
আমরা সবাই বিস্মিত হয়ে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম। দার্শনিক ভাবুক টাইপের লোকদের চোখও কোন কিছু এড়ায় না। এরা সবই দেখে সবই শোনে শুধু চুপচাপ থাকে । সব বিষয়ে জড়িয়ে সময় নষ্ট করে না। মনের মাঝে আনন্দের পরিবর্তে বিষাদে ভরে গেলো। সে কথা ভেবে আজও দুঃখ পাই।
 
কঠিন ও কল্পিত বিষয় বলে কোন প্রশিক্ষক Aerodynamics বিষয়টি পড়াতে চাইতেন না। মাহমুদ স্যারের পরে এই সাবজেক্ট টি পড়াতেন জামালপুরের সরিষাবাড়ির পিংনার গোলাম কিবরিয়া স্যার। তিনি ইংরেজী সাহিত্য, আইন ও রাষ্ট্র বিজ্ঞান এই তিনটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী ছিলেন। কিবরিয়া স্যার প্রথমে আমার সরাসরি স্যার ছিলেন। অতঃপর আমার রেজাল্ট ভালো বিধায় আমাকেও প্রশিক্ষক হিসাবে পদায়ন করা হলে আমিও তাঁর সহকর্মী বনে যাই খুব কম বয়সে। অন্যরা সাধারণত যে বয়সে প্রশিক্ষক হয় সেই বয়সে আমি, টিপু, মরহুম এনাম ১০ বছর সফলতার সাথ প্রশিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করে বের হয়ে গেছি। প্রশিক্ষক হবার পর কিবরিয়া স্যার ও আমি পাশাপাশি বসতাম ১৯৯৬ সাল থেকে। এখানে বলে রাখি ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষায় যারা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হতো তাঁদেরকে প্রশিক্ষক হিসাবে রেখে দেয়া হতো। শতভাগ লেসন প্লান মেনে সাপ্তাহে ৪৫ মিনিটের ২৪ ক্লাস নিতে হতো।
 
কিবরিয়া স্যার বিদায়ের পর ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর মতিউর স্যারকেই দায়িত্ব নিতে হলো Aerodynamics পড়ানোর। তিনিও চলে গেলেন নির্ধারিত ১৮ বছর চুক্তির পর। অতঃপর Aerodynamics এর হাল ধরলাম আমি। এর মধ্যে কুমিল্লার দাউদকান্দির মাহফুজ স্যার যুক্ত হলেন। আমি Aero Engg Squadron এ Office এ বসতে শুরু করলে মাহফুজ স্যার এরোডাইনামিক্স পড়াতেন। চুক্তিশেষে তিনিও চলে গেলেন। পরে নভো ও জিএমজি এয়ার লাইন্সের প্রকৌশলী ছিলেন বলে শুনেছি। কিবরিয়া স্যারও একটি বেসরকারি কলেজের ভিপি (ভাইস প্রিনসিপ্যাল) । মতিউর স্যারও একটি কলেজের ভিপি ছিলেন। কলেজ দূরে হওয়ায় এখন মিঠাপুকুরের একটি স্কুলের ভিপি। অমিও চুক্তিশেষে গুড বাই জানাই। আমাকে সহ সবাইকে কতৃপক্ষ Tenure বাড়াতে বলেছিলো। আমরা বাড়াইনি। মতিয়ার স্যারকে ফেসবুকে পাওয়ার পর আরও অনেক কথা মনে পড়ছে। যে যেখানে যেমন থাকুক ভালো থাকুক। তবে সম্পর্কটা অটুট থাক অন্তত মনে। সব তো লিখা সম্ভব নয়। দুই যুগ পরের লিখা। ভুল হলে ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখার বিনীত অনুরোধ রইলো। পরিশেষে আমার লিখা ” সম্পর্ক” কবিতার চারটি লাইন দিয়ে শেষ করছি…
 
“হেলায় হারানো আপনজনও
ক্রমান্বয়ে বনে অন্য!
মুখ ফিরালে ক্রমে ক্রমে
বসতবাটিও হয় অরণ্য!”
 
স্মৃতিকথাঃ এরোডাইনামিক্সের স্যার
এ কে সরকার শাওন
শাওনাজ, উত্তরখান, ঢাকা।
৬ জুলাই ২০২১

Leave a Reply

Your email address will not be published.