৮ বছরে সর্বোচ্চ দামে এলপিজি, ভোক্তাদের নাভিশ্বাস

বিশ্ববাজারে হু হু করে বাড়ছে এলপিজির দাম। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রভাবে বাড়ছে এ জ্বালানির দাম। বর্তমানে এলপিজির অন্যতম উপাদান প্রোপেনের দাম প্রতি মেট্রিক টন ৮৯৫ ডলার এবং বিউটেন ৯২০ ডলার। এ মূল্য গত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত বছর এ সময়ে দাম ছিল এক-তৃতীয়াংশ কম।

২০২১ সালের মার্চে প্রতি মেট্রিক টন প্রোপেনের দাম ছিল ৬২৫ ডলার এবং বিউটেন ৫৯৫ ডলার। করোনা মহামারি শুরুর পর ২০২০ সালের এপ্রিলে এলপিজির দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। ওই মাসে প্রোপেন ২৩০ ডলার এবং বিউটেন ২৪০ ডলার ছিল। এলপিজির বিশ্ববাজারে সৌদি আরামকোর মূল্য অনুযায়ী বিশ্বে এলপিজির দাম নির্ধারিত হয়।

এদিকে চলতি মার্চে বেসরকারি খাতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের এলপিজির মূল (ভ্যাটসহ) এক হাজার ২৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৩৯১ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বৃহস্পতিবার (৩ মার্চ) সন্ধ্যা ৬টা থেকে এ মূল্য কার্যকর হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, দেশীয় বাজারে ভোক্তাপর্যায়ে গত নভেম্বরে ১২ কেজির এলপি গ্যাসের দাম সর্বোচ্চ এক হাজার ৩১৩ টাকা করা হলেও পরের মাসগুলোতে কমে যায়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে কমলেও ফেব্রুয়ারিতে কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ২৪০ টাকায়। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার আরও এক দফা বাড়িয়ে এক হাজার ৩৯১ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপিজিএলের সাড়ে ১২ কেজির এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম এখনো ৫৯১ টাকা।

জানা গেছে, এলপিজি তৈরির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। প্রতি মাসে এলপিজির এ দুই উপাদানের মূল্য প্রকাশ করে সৌদি আরামকো। এটি কার্গো মূল্য (সিপি) নামে পরিচিত। সৌদি সিপিভিত্তি মূল্য ধরে দেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করে থাকে বিইআরসি। ৩৫ অনুপাত ৬৫ হিসাবে প্রোপেন ও বিউটেনের মিশ্রণ করার পরে মূল্য একই হওয়ার কারণে গড়মূল্যও একই দাঁড়ায়।

সৌদি সিপির মূল্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২০ সালের শুরুতে বৈশ্বিক অতিমারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে লকডাউনে স্থবির হয়ে পড়ে সারা বিশ্ব। ২০২০ সালের এপ্রিলে ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন দামে নামে এটি। ওই মাসে প্রোপেন প্রতি টন ২৩০ ডলার এবং বিউটেন ২৪০ ডলারে বিক্রি হয়। তবে পরের মাসেই দাম বেড়ে প্রোপেন-বিউটেন দুটির দামই ৩৪০ ডলারে উঠে যায়। এরপর দাম বাড়তে বাড়তে গত বছরের নভেম্বরে সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে উঠে। ওই মাসে প্রোপেন ৮৭০ ডলার এবং বিউটেন ৮৩০ ডলারে দাঁড়ায়। পরে দুই মাস কমলেও আবার বাড়ে দাম। গত এক মাসে প্রতি টন প্রোপেনের দাম বেড়েছে ১২০ ডলার এবং বিউটেনের দাম বেড়েছে ১৪৫ ডলার।

তথ্যমতে, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রোপেন এক হাজার ১০ ডলার এবং বিউটেন এক হাজার ২০ ডলারে দাম ওঠে। পরবর্তীসময়ে কমে ওই বছরের নভেম্বরে প্রোপেনের দাম প্রতি টন ৬১০ ডলার এবং বিউটেন ৬০০ ডলারে নেমে যায়।

এদিকে, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বর্তমানে দেশে গৃহস্থলী, হোটেল, রেস্তোরাঁয় বেশি ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে ৫৮টি অপারেটর জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে লাইসেন্স নিলেও ২৮টি অপারেটর বাজারে তাদের অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করেছে। বড় বড় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাল্ক এলপিজি আমদানি করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে এ এলপি গ্যাসের ৯৮ শতাংশই আমদানি করতে হয়। যার পুরোটা আসে বেসরকারি মাধ্যমে। বর্তমানে বেসরকারি উদ্যোক্তারা বছরে প্রায় ১২ লাখ টনের বেশি এলপিজি আমদানি করে বোতলজাত করে সাধারণ ভোক্তাপর্যায়ে সরবরাহ করছেন। এ খাতে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।

এলপিজি গ্যাস পরিবেশক সমিতি চট্টগ্রামের সভাপতি খোরশেদুর রহমান বলেন, ‘গৃহস্থলীতে দেশে দিনে দিনে এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে। ব্যবসায়ের পরিধিও বাড়ছে। বেসরকারি জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এলপিজির বাজার দখলে নিয়েছে। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপিজিএলের সক্ষমতা আরও কমেছে। গত ১২ বছর নতুন কোনো সিলিন্ডার বাড়েনি।’

তিনি বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রভাবের নামে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকারি রেগুলেটরি অথরিটিকেও দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে অনেকটা বাধ্য করা হচ্ছে। এখন বাজারে ১২ কেজির এলপিজির দাম এক হাজার ৩৯১ টাকা করা হয়েছে। অথচ সরকারি এলপিজিএলের দাম অর্ধেকের চেয়েও কম। এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সাধারণ ভোক্তারা সুফল ভোগ করতো।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.