মোঃ একরামুল ইসলাম।
গল্প নয়, সত্যি! ২০১৫ সালে বলিউডে মুক্তি পায় ‘মাঝি দ্য মাউন্টেন ম্যান’ নামের একটি ছবি। বিহারের এক গরীব শ্রমিককে নিয়ে ছবির গল্প তৈরি হয়।

যার মূলে ছিলেন দশরথ মাঝি। গেহলর গ্রামে যার বাস ছিলো। কিন্তু এই গ্রামের মানুষদের নিত্যদিনের চাহিদা মেটাতে পায়ে হেঁটে প্রায় ৩শ ফুট উঁচু পাহাড় পাড়ি দিয়ে শহরে যেতে হত। সেই পাহাড় পাড়ি দিতে গিয়েই একদিন পড়ে যান দশরথের প্রিয়তমা স্ত্রী। রাস্তা না থাকায় চিকিৎসকের কাছে নিতে পারেনি তার স্ত্রীকে। তখন মৃত্যু হয় দশরথের স্ত্রীর।


সেই শোক সামলাতে না পেরে দশরথ মাঝি সিদ্ধান্ত নিলেন, ৩শ ফুট উঁচু পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরী করবেন। যেন তার স্ত্রীর মত আর কারো জীবন দিতে না হয়। শত প্রতিবন্ধকতার পাশ কেটে শুধু শাবল আর হাতুড়ি দিয়ে খোদাই করলেন ৩৬০ ফুট লম্বা, ২৫ ফুট গাঢ় ও ৩০ ফুট প্রশস্ত এক পথের! আর এতে তার সময় লেগে গেলো দীর্ঘ ২২ বছর! সত্য ঘটনা অবলম্বনে বলিউডের সেই ছবিতে দশরথ মাঝির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ভারতের অভিনেতা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী।


পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরী না করলেও বাংলাদেশে আছেন তেমনি একজন সংগ্রামী মানুষ। নাম তার ইলিয়াস কাঞ্চন। দশরথ মাঝির মতোই তারও আছে তেমন একটি ত, একটি শোক। যেই ত তিনি বয়ে চলেছেন বিগত ২৬ বছর ধরে। কী সেই ত?


১৯৯৩ সালে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় এলোমেলো হয়ে যায় নব্বই দশকের জনপ্রিয় নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবন। কারণ ওই বছরের ২২ অক্টোবর তার একটি ছবির স্যুটিং দেখতে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তার স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন। শোকার্ত ইলিয়াস কাঞ্চন এরপর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আর সিনেমাও করবেন না! কিন্তু সব ভেবে রিলের নায়ক থেকে রিয়েল লাইফের প্রতিবাদি নায়ক হয়ে দাঁড়িয়ে যান রাস্তায়। গড়ে তোলেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নামের সংগঠনটি। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে ভালো যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে, তার সবটুকু দুঃখ-কষ্টের দান। মানুষ দুঃখ না পেলে, কষ্ট না পেলে কোনো কিছু সৃষ্টি করার প্রয়াস থাকে না। তেমনি ইলিয়াস কাঞ্চন তার স্ত্রী হারানোর কষ্ট থেকেই ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ সংগঠনটি গড়ে তোলেন এবং সেই থেকে নিঃস্বার্থভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।


দশরথ মাঝি ২২ বছর কিছু না ভেবে পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ করেছেন যেন তার স্ত্রীর মতো আর কারো মৃত্যু না হয়। তেমনি ইলিয়াস কাঞ্চন বিগত ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। যেন তার স্ত্রীর মতো এমন মর্মান্তিক মৃত্যু আর কোনো পরিবারকে এলোমেলো না করে দেয়।


কিন্তু এই আন্দোলন করে বার বার বিভিন্ন মহলের হুমকির শিকার হয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে গত কয়েকদিন বাংলাদেশের বাস-ট্রাক শ্রমিকেরা যে ‘কর্মবিরতি’ পালন করেছেন। সেখানে চলচ্চিত্র নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবিকে অপমান করার অভিযোগ উঠেছে। অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবি সম্বলিত ব্যানার টাঙিয়ে কিংবা কুশপুত্তলিকা তৈরি করে সেখানে জুতার মালা দেয়া হয়েছে। এ লজ্জা কার! এ লজ্জা ১৮ কোটি মানুষের।


এসব আচরণে কষ্ট পেলেও থেমে যাওয়ার পাত্র নন রাজপথের এই লড়াকু। তিনি বলেছেন, নিজের ক্যারিয়ার জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করে সড়ক নিরাপদের যে আন্দোলন শুরু করেছিলাম, সেটা আমি চালিয়েই যাবো।

তিনি বারবার বলছেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হলে ৯০ ভাগ দুর্ঘটনা কমে যাবে! এবার সড়ক আইনের সঠিক প্রয়োগ না হলে হেরে যাবে বাংলাদেশ! এই আইন অচিরেই কার্যকর হলে একদিকে যেমন সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে অন্যদিকে রিলের নায়ক থেকে বাস্তবের নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা শীর্ষে পৌঁছে যাবে রাস্তার রাজা ইলিয়াস কাঞ্চন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.